মণিপুরের কাংপোকপিতে বকেয়া ডিবিটির দাবিতে হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের বিক্ষোভ, সরকারকে পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম

নিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি) অবিলম্বে ছাড়ের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। তারা সরকারকে পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে নিয়মিত মাসিক সহায়তা, স্বচ্ছ অর্থপ্রদান ব্যবস্থা এবং সকল যোগ্য পরিবারকে বৈষম্যহীনভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

মণিপুরের কাংপোকপি জেলায় অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত (আইডিপি) হাজারো মানুষ শুক্রবার জেলা সদর দফতরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করে সরকারের কাছে বকেয়া ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি) অবিলম্বে ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, জাতিগত সহিংসতায় বাড়িঘর, কর্মসংস্থান ও জীবিকা হারানো হাজারো পরিবারের জন্য এই আর্থিক সহায়তাই বর্তমানে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাদের অভিযোগ, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের সহায়তার অর্থ এখনও না পাওয়ায় খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক প্রয়োজনীয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কাংপোকপি জেলা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত কল্যাণ কমিটি (KDIDWC)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভে ত্রাণশিবির ও ভাড়াবাড়িতে বসবাসকারী হাজারো পরিবার অংশ নেয়। নারী, প্রবীণ, শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও এতে অংশগ্রহণ করেন। একাধিক সামাজিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক নেতাও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর সমর্থনে উপস্থিত ছিলেন।

বিক্ষোভকারীরা এমন পোস্টার বহন করেন, যেখানে উল্লেখ ছিল যে তাদের আর বাড়ি নেই, কর্মসংস্থান নেই এবং এখন আর্থিক সহায়তাও মিলছে না। তাদের বক্তব্য, সরকারের ডিবিটি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবন সংকটে পড়েছে।

বিক্ষোভের পর একটি প্রতিনিধিদল উপমুখ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়। এতে বকেয়া ডিবিটি অবিলম্বে ছাড় এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত মাসিক আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়।

কমিটি সরকারকে পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া অর্থ ছাড়া না হলে তারা গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন আরও জোরদার করবে। বিক্ষোভকারীরা আরও বলেন, সহায়তা প্রদানে আরও বিলম্ব হলে তার সম্পূর্ণ দায় সরকারের হবে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একাধিক বাস্তুচ্যুত পরিবার জানায়, ডিবিটি সহায়তার বড় অংশ শিশুদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হয়। এই অর্থ দিয়ে স্কুল ফি, ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি, বই এবং ইউনিফর্ম কেনা হয়। অর্থপ্রদান বিলম্বিত হওয়ায় অনেক শিশুর ফি জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং তারা পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে।

কমিটির দাবি, দ্রুত সহায়তা না পেলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হতে পারে, যার ফলে তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর বক্তব্য, ত্রাণের অর্থ দিয়েই তারা চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী কিনে থাকেন। সহায়তা না পাওয়ায় একাধিক ত্রাণশিবিরে খাদ্যসামগ্রীর মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি পরিবার জানিয়েছে, সীমিত সম্পদের কারণে তাদের খাবার ও ওষুধের মধ্যে একটি বেছে নিতে হচ্ছে।

কমিটির মতে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা জাতিগত সংঘাতের কারণে হাজারো পরিবার তাদের গ্রাম, কৃষিজমি, ব্যবসা এবং কর্মসংস্থান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। অধিকাংশ পরিবার এখনও ত্রাণশিবির বা ভাড়াবাড়িতে বসবাস করছে এবং তাদের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই।

এই পরিস্থিতিতে সরকারি আর্থিক সহায়তা তাদের জন্য শুধু ত্রাণ নয়, বরং বেঁচে থাকার ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিরাপদে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু না করা পর্যন্ত সরকারকে এই সহায়তা চালিয়ে যেতে হবে।

স্মারকলিপিতে কমিটি শুধু বকেয়া অর্থ ছাড়ের দাবি জানায়নি, ভবিষ্যতের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও চালুর দাবি তুলেছে। তাদের বক্তব্য, প্রতি মাসে নির্দিষ্ট তারিখে সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করা হলে পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারবে।

এছাড়া সব যোগ্য বাস্তুচ্যুত পরিবারের কাছে কোনো বৈষম্য ছাড়াই সহায়তা পৌঁছানো এবং পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখার দাবিও জানানো হয়েছে।

কমিটি জানিয়েছে, উপকারভোগীদের যাচাই ও অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়ায় তারা সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটের দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে বলেও তারা উল্লেখ করেছে।

কমিটি মুখ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রতি এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, হাজারো শিশুর শিক্ষা, প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জীবন এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে বিক্ষোভকারীরা সরকারের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। নির্ধারিত পাঁচ দিনের মধ্যে বকেয়া ডিবিটি ছাড়া না হলে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ ঘোষণা করা হতে পারে। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আল্টিমেটাম সম্পর্কে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য সময়মতো আর্থিক সহায়তা শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই এই বিষয়টির দ্রুত সমাধান হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

 

Leave a comment