মিস ওয়ার্ল্ড ২০১৭ এবং বলিউড অভিনেত্রী মানুষী ছিল্লার সম্প্রতি তাঁর জীবনের সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করেছেন, যখন মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিতর্ক তাঁর পড়াশোনা ও মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এক আলোচনায় তিনি জানান, চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে তাঁকে নিজের বহু ব্যক্তিগত আনন্দ ও আগ্রহ থেকে সরে আসতে হয়েছিল।
বর্তমানে মানুষী ছিল্লার বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ হলেও, তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল চিকিৎসা ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়া। চিকিৎসক পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি মেডিক্যাল শিক্ষা গ্রহণ করে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তবে ২০১৫ সালে মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি তাঁর পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
মানুষী জানান, পরীক্ষা পুনরায় আয়োজনের পরিস্থিতি তাঁর পুরো দৈনন্দিন জীবন বদলে দিয়েছিল। সে সময় তিনি নিজের প্রায় সব শখ ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সীমিত করে দেন। তিনি বলেন, তিনি প্রশিক্ষিত কুচিপুড়ি নৃত্যশিল্পী ছিলেন এবং ছবি আঁকতেও খুব পছন্দ করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়াও তাঁর প্রিয় কাজের মধ্যে ছিল। কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিতে তাঁকে এসব থেকে দূরে থাকতে হয়।
তাঁর মতে, প্রায় এক বছর তাঁর জীবন পড়াশোনা, কোচিং এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল একটিমাত্র লক্ষ্য—মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হওয়া।
মানুষী তাঁর অভিজ্ঞতাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বলেন, মেডিক্যাল ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী একই ধরনের চাপ ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। প্রস্তুতির সময় তিনি এমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিত হন, যাঁদের পরিবার কোচিংয়ের খরচ বহন করতে আর্থিক কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিল। অনেক শিক্ষার্থী ছোট শহর ও মফস্বল থেকে বড় শহরে এসে সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকে দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন।
তাঁর মতে, এসব শিক্ষার্থীর কাছে প্রায়শই কোনো বিকল্প পরিকল্পনা থাকত না এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করত। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ শুধু শিক্ষাগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তরেও গভীর প্রভাব ফেলে।
অভিনেত্রী জানান, দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক প্রস্তুতির পর মানসিক ক্লান্তি অনুভব করা স্বাভাবিক। মাসের পর মাস পরিশ্রমের পর আবার অতিরিক্ত সময় ধরে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হলে অনুপ্রেরণা বজায় রাখা সহজ নয়। তিনি এই সময়ে তাঁর বাবা-মায়ের সহযোগিতাকে সবচেয়ে বড় শক্তি বলে উল্লেখ করেন।

মানুষীর মতে, তাঁর বাবা-মা প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাস্কেটবল খেলা, জিমে যাওয়া বা অন্য কোনো ব্যায়াম—এই এক ঘণ্টা তাঁকে মানসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও ইতিবাচক থাকতে সাহায্য করেছে। তাঁর বিশ্বাস, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক সুস্থতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষী বলেন, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তখনই শুরু হয়েছে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছিল কেবল প্রথম ধাপ, আর মেডিক্যাল শিক্ষার পথ ছিল আরও কঠিন ও অধিক পরিশ্রমসাপেক্ষ। তিনি স্মরণ করেন, তাঁর সিনিয়র শিক্ষার্থীরা মজা করে বলতেন, মেডিক্যাল কলেজে আনন্দের দিন খুব কম, কারণ পড়াশোনার চাপ সবসময় বজায় থাকে।
পরবর্তীতে তিনি উপলব্ধি করেন, এটি শুধু ক্লান্তি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে একই লক্ষ্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে তৈরি হওয়া মানসিক বার্নআউটও ছিল। তাঁর মতে, যখন তিনি ভেবেছিলেন লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, তখনই বুঝতে পারেন সামনে আরও বড় একটি পথ অপেক্ষা করছে।
সময়ের সঙ্গে মানুষী ছিল্লার জীবনের পথ পরিবর্তন করে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার জগতে প্রবেশ করেন। ২০১৭ সালে মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব জয়ের পর তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেন এবং পরে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। ২০২২ সালে ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি বলিউডে অভিষেক করেন। এরপর তিনি ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি’, ‘বড়ে মিয়াঁ ছোটে মিয়াঁ’ এবং ‘অপারেশন ভ্যালেন্টাইন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
মানুষীর মতে, মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সেই সময়ের সংগ্রাম তাঁকে শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং চাপের মধ্যে কাজ করার দক্ষতা শিখিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, এই গুণগুলো পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।







