চালকুমড়ো থেকে আমলকী! নবাবি রান্নাঘরেই জন্ম ‘মোরব্বা’র, বীরভূমের ইতিহাসে লুকিয়ে মিষ্টির চমক

চালকুমড়ো থেকে বেল, আমলকী থেকে পাতিলেবু— কীভাবে ফসল সংরক্ষণের উপায় থেকে জন্ম নিল মোরব্বা? জেনে নিন বীরভূমের রাজনগরের ঐতিহাসিক কাহিনি।

আজকের দিনে মোরব্বা মানেই অনেকের কাছে মিষ্টি স্বাদের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। কিন্তু এই মোরব্বার জন্ম যে একসময় ফসল বাঁচানোর প্রয়োজনে হয়েছিল, তা অনেকেরই অজানা। বীরভূমের রাজনগরে প্রায় তিনশো বছর আগে নবাব বাদিওজ্জামানের আমলে শুরু হয়েছিল এই অভিনব খাদ্যসংস্কৃতির পথচলা। অতিরিক্ত ফলন হওয়া ফল ও সবজি যাতে নষ্ট না হয়, সেই চিন্তা থেকেই তৈরি হয়েছিল চিনির রসে ডোবানো বিশেষ মিষ্টান্ন— ‘মোরব্বা’।

চালকুমড়ো থেকে আমলকী! নবাবি রান্নাঘরেই জন্ম ‘মোরব্বা’র, বীরভূমের ইতিহাসে লুকিয়ে মিষ্টির চমক
রাজনগরের নবাবি ইতিহাসেই লুকিয়ে মোরব্বার সূত্রপাত

বর্তমান সিউড়ির কাছেই অবস্থিত প্রাচীন রাজনগর। একসময় এটি ছিল বীরভূমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ১৭১৮ থেকে ১৭৫২ সালের মধ্যে নবাব বাদিওজ্জামানের শাসনকালে রাজনগরে কৃষিকাজ ও বাগানচর্চায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়। লাল মাটির শুষ্ক অঞ্চল হলেও নবাবের উদ্যোগে সেখানে দেশ-বিদেশের নানা ফল ও সবজির চাষ শুরু হয়।

অতিরিক্ত ফলন থেকেই নতুন মিষ্টির ভাবনা

নবাবের উদ্যোগে ফলন এতটাই বেড়ে যায় যে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও বিপুল পরিমাণ ফল ও সবজি অবিক্রীত থেকে যেতে শুরু করে। ফলে পচে নষ্ট হচ্ছিল প্রচুর ফসল। সেই সমস্যা থেকেই নতুন উপায় খুঁজতে শুরু করেন বাদিওজ্জামান। ইতিহাস বলছে, তখনই বাইরে থেকে ডেকে আনা হয় এক পাঠান হালুইকরকে। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় মোরব্বা তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

চালকুমড়ো থেকে আমলকী! নবাবি রান্নাঘরেই জন্ম ‘মোরব্বা’র, বীরভূমের ইতিহাসে লুকিয়ে মিষ্টির চমক
চালকুমড়ো দিয়ে শুরু, পরে যোগ হয় বেল-পেঁপে-আম

প্রথমদিকে চালকুমড়ো দিয়েই তৈরি করা হয় মোরব্বা। পরে ধীরে ধীরে পেঁপে, বেল, আম, আমলকী, পাতিলেবু ও হরীতকীর মতো ফল নিয়েও শুরু হয় নতুন পরীক্ষা। বিভিন্ন ফল ও সবজিকে কেটে পরিষ্কার করে চিনির ঘন রসে ডুবিয়ে সংরক্ষণ করা হত। ধীরে ধীরে এই সংরক্ষণ পদ্ধতিই এক নতুন ধরনের মিষ্টান্নে পরিণত হয়।

সংরক্ষণের উপায় থেকে জনপ্রিয় মিষ্টান্ন

ফসল দীর্ঘদিন ভালো রাখার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটাই পরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সুস্বাদু খাবার হিসেবে। রাজনগরের মোরব্বা দ্রুত পরিচিতি পেতে শুরু করে আশপাশের জেলা ছাড়িয়ে ভিনরাজ্যেও। ব্রিটিশ আমলে সিউড়ি সদর শহরের মর্যাদা পাওয়ার পর ধীরে ধীরে রাজনগরের বহু ঐতিহ্য সরে আসে সিউড়িতে। সেই সঙ্গে সিউড়ির নামের সঙ্গে জুড়ে যায় বিখ্যাত মোরব্বার পরিচয়ও।

চালকুমড়ো থেকে আমলকী! নবাবি রান্নাঘরেই জন্ম ‘মোরব্বা’র, বীরভূমের ইতিহাসে লুকিয়ে মিষ্টির চমক
মোরব্বার প্রতিটি স্বাদে ইতিহাসের ছোঁয়া

আজও সিউড়ির বিভিন্ন দোকানে নানা ধরনের মোরব্বা পাওয়া যায়। শুধু স্বাদের জন্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের খাদ্যঐতিহ্য ও কৃষিভিত্তিক ইতিহাস। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে মোরব্বা শুধু মিষ্টি নয়, বরং একসময়কার সংরক্ষণ প্রযুক্তিরও এক অনন্য নিদর্শন।

চালকুমড়ো থেকে আমলকী! নবাবি রান্নাঘরেই জন্ম ‘মোরব্বা’র, বীরভূমের ইতিহাসে লুকিয়ে মিষ্টির চমক
বীরভূমের রাজনগরে নবাব বাদিওজ্জামানের আমলে অতিরিক্ত ফলন হওয়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের উপায় খুঁজতেই জন্ম নেয় ‘মোরব্বা’। চালকুমড়ো দিয়ে শুরু হলেও পরে পেঁপে, বেল, আম, আমলকী থেকে পাতিলেবু— নানা উপাদানে তৈরি হতে থাকে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন। আজও সিউড়ির মোরব্বা সেই ইতিহাস বহন করে চলেছে।

Leave a comment