নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

মুর্শিদাবাদের কোহিতুর, রানী পসন্দ, সফদার পসন্দের মতো ঐতিহ্যবাহী নবাবি আম এখন বিলুপ্তির পথে। রইস বাগে এখনও টিকে আছে বিরল আমের ইতিহাস।

গরমকাল মানেই আমের মৌসুম। আর বাংলার আম মানেই মালদহ কিংবা মুর্শিদাবাদের নাম সবার আগে উঠে আসে। কিন্তু নবাবি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মুর্শিদাবাদের বহু দুর্লভ আমের প্রজাতি আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় নবাবদের বাগানে যে আমের গন্ধে মাতোয়ারা থাকত রাজপ্রাসাদ, আজ সেই আম খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। উদ্যান বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সংরক্ষণে উদ্যোগ না নিলে বহু ঐতিহ্যবাহী আম চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

নবাবি আমের ঐতিহ্যে গর্বিত মুর্শিদাবাদ

মুর্শিদাবাদের সঙ্গে আমের সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। নবাবি আমলে জেলার বিভিন্ন প্রাসাদ ও বাগানে বিরল প্রজাতির আম চাষ করা হত অত্যন্ত যত্নে। শুধু স্বাদ নয়, সুগন্ধ, রং এবং আকারের দিক থেকেও এই আমগুলির আলাদা পরিচিতি ছিল। এখনও জেলার কিছু পুরনো পরিবার সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

কোন কোন আম এখন বিলুপ্তির পথে?

উদ্যান পালন দফতরের আধিকারিকদের মতে, জেলার বহু ঐতিহ্যবাহী আম এখন কার্যত দুর্লভ। বিশেষ করে কোহিতুর, রানী পসন্দ, সফদার পসন্দ, মির্জা পসন্দ, কালাপাহাড়, মোলায়েমজাম, চম্পার মতো প্রজাতিগুলি খুব কম বাগানেই দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই একটি বা দু’টি গাছই বেঁচে রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই আমগুলির অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

রইস বাগে এখনও টিকে আছে ইতিহাস

মুর্শিদাবাদের তোপখানা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী রইস বাগ আজও নবাবি আমের স্মৃতি বহন করে চলেছে। জানা যায়, মীরজাফরের বংশধর সৈয়দ রইস মির্জা ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে এই বাগান তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে সেখানে এখনও ৭৬ রকমের আমের অস্তিত্ব রয়েছে। একসময় পুরনো নবাবি বাগানগুলি ধ্বংস হতে শুরু করলে ঐতিহ্য বাঁচাতে শতাধিক প্রজাতির আম সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এই বাগানে।

নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

দাম শুনলেও চমকে উঠবেন

এই বিরল আমগুলির বাজার মূল্যও অত্যন্ত বেশি। জেলার কিছু বিশেষ আমের দাম প্রতি পিস ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। স্বাদ, গন্ধ এবং ঐতিহ্যের কারণেই সংগ্রাহক ও আমপ্রেমীদের কাছে এই আমের আলাদা কদর রয়েছে। তবে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এইসব প্রজাতি।

হারিয়ে যাচ্ছে নবাবি বাগানের স্মৃতি

একসময় জাফরাগঞ্জ প্রাসাদের উল্টোদিকে ছিল বিখ্যাত ফৈয়াজ বাগ। নবাব ফৈয়াজ আলি খানের সেই বাগানে কোহিতুর, কালাপাহাড়, নবাব পসন্দ, বেগম পসন্দ, মোলায়েম জংয়ের মতো অসংখ্য বিরল আমের চাষ হত। এখন সেই বাগানের অনেকটাই ইতিহাস। বাগানের অস্তিত্ব প্রায় মুছে গেলেও তার গল্প এখনও জীবন্ত স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে।

নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

কেন কমছে এই আমের সংখ্যা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে বেশি লাভজনক হিমসাগর, ল্যাংড়া বা ফজলির মতো আমের চাষ বাড়ায় পুরনো প্রজাতির আমের চাষ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ুর পরিবর্তন, পুরনো বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহও বড় কারণ। ফলে নবাবি আমের ঐতিহ্য আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে।

নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্কট! মুর্শিদাবাদ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিরল আমের প্রজাতি, চিন্তায় উদ্যান বিশেষজ্ঞরা

মুর্শিদাবাদের নবাবি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একাধিক বিরল আমের প্রজাতি আজ বিলুপ্তির মুখে। কোহিতুর, রানী পসন্দ, সফদার পসন্দ, কালাপাহাড়ের মতো ঐতিহ্যবাহী আম এখন হাতে গোনা কয়েকটি বাগানেই সীমাবদ্ধ। সংরক্ষণ না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো নামই শুধু শুনবে এই আমগুলির।

Leave a comment