রান্নাঘরে তেল ছাড়া খাবার তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু প্রতিদিনের রান্নায় কোন তেল ব্যবহার করছি, সেটাই হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরষের তেল, সূর্যমুখী তেল কিংবা অন্য কোনও রিফাইন্ড অয়েল—কোনটি তুলনামূলক ভালো? আবার শুধু তেলের ধরন জানলেই কি হবে, নাকি পরিমাণের দিকেও নজর রাখা দরকার? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
সরষের তেল কি ভালো বিকল্প?
ভারতীয় রান্নায় সরষের তেলের ব্যবহার বহুদিনের। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরষের তেলে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বা MUFA-এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। রান্নার ধরন অনুযায়ী এটি ভাজাভুজি বা তুলনামূলক বেশি তাপে রান্নার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়।সরষের তেলের স্মোক পয়েন্টও তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় উপযুক্ত রান্নার পদ্ধতিতে এটি ব্যবহার করা সুবিধাজনক হতে পারে। তবে শুধু একটি তেলকে ‘হার্টের জন্য সেরা’ বলে ধরে নেওয়ার বদলে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং তেলের মোট পরিমাণকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সূর্যমুখী তেলে কী রয়েছে?
সূর্যমুখী তেলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড বা PUFA বেশি থাকে। পাশাপাশি এতে ভিটামিন ই-ও রয়েছে। তাই সূর্যমুখী তেলকে শুধুমাত্র ‘খারাপ তেল’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।তবে রান্নার ক্ষেত্রে তেলকে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত বেশি তাপে ব্যবহার না করাই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের ভারসাম্য বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘রিফাইন্ড’ মানেই কি ক্ষতিকর?
পরিশোধিত বা রিফাইন্ড তেল নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা ধারণা রয়েছে। রিফাইনিংয়ের সময় তেলকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এতে কিছু প্রাকৃতিক উপাদান কমে যেতে পারে।অন্যদিকে কোল্ড-প্রেসড বা ভার্জিন তেল তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ধরে রাখতে পারে। তবে কোন তেল কোন রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উপরও বিষয়টি নির্ভর করে। তাই শুধু ‘রিফাইন্ড’ বা ‘আনরিফাইন্ড’ লেখা দেখেই কোনও তেলকে সম্পূর্ণ ভালো বা খারাপ বলা ঠিক নয়।
তেলের পরিমাণই আসল বিষয়
হার্টের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তেলের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ কতটা তেল খাচ্ছেন। বেশি তেল মানেই বেশি ক্যালোরি। নিয়মিত অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে, যা ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক রান্নার তেলের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। বিস্কুট, চিপস, ভাজাভুজি ও বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার থেকেও অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরে ঢুকতে পারে—সেটিও হিসেবের মধ্যে রাখা জরুরি।
হার্টের সমস্যা থাকলে আরও সতর্কতা
যাঁদের হৃদরোগ, উচ্চ LDL কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড বেড়ে যাওয়া, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার বা ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে তেলের পরিমাণ নিয়ে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।এক্ষেত্রে নিজের মতো করে তেল সম্পূর্ণ বন্ধ না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনিক মোট ফ্যাট ও তেলের পরিমাণ ঠিক করা ভালো। কারণ প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা, ওজন, বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও রোগের ধরন এক নয়।
একটাই তেল নাকি বদলে বদলে?
দেওয়া প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের তেল পর্যায়ক্রমে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিডের ভারসাম্য রাখা।তবে তেল বারবার বদলানোর চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হল—অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করা, একই তেল বারবার উচ্চ তাপে ব্যবহার না করা এবং রান্নায় তেলের পাশাপাশি শাকসবজি, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের ভারসাম্য রাখা।
তাহলে কোন তেল খাবেন?
সরষের তেল বা সূর্যমুখী তেল—দুটিরই আলাদা ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইল রয়েছে। তাই একটি তেলকে সবার জন্য একমাত্র সেরা বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়।সরষের তেল ভারতীয় রান্নায় উপযোগী একটি বিকল্প হতে পারে, আর সূর্যমুখী তেল থেকেও PUFA ও ভিটামিন ই পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত তেলের গুণমান, রান্নার পদ্ধতি, মোট পরিমাণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন—সবকিছুর উপরই সঠিক পছন্দ নির্ভর করে।
রান্নার তেল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সরষের তেল না রিফাইন্ড—এই প্রশ্নই যথেষ্ট নয়। তেলের ধরন, পরিমাণ এবং কীভাবে রান্নায় ব্যবহার করা হচ্ছে, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, সরষের তেলে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে এবং সূর্যমুখীর তেলে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি। তবে যে তেলই ব্যবহার করা হোক, অতিরিক্ত তেল খাওয়ার অভ্যাস এড়ানো জরুরি।













