গঙ্গার বুকের জলে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কলাগাছের ভেলা। তার উপর বসে এক নারী, পাশে শুয়ে ‘নিথর’ স্বামী। প্রথম দেখায় যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এটি কোনও বাস্তব ঘটনা নয়—মনসামঙ্গলের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিকে কেন্দ্র করে নবদ্বীপের এক অভিনব লোকাচার। প্রায় ১৬ বছর ধরে মনসা পুজোর বিসর্জনের দিনে এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান স্থানীয় মানুষ।
১৬ বছর ধরে চলে আসছে এই বিশেষ রীতি
নদিয়ার নবদ্বীপের চরব্রহ্মনগর এলাকায় মনসা পুজো ঘিরে পাঁচ দিনব্যাপী মেলার আয়োজন হয়। পুজোকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়।তবে এই উৎসবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল বিসর্জনের দিনে কলাগাছের ভেলায় বেহুলা ও লখিন্দরের প্রতিকৃতি ভাসিয়ে দেওয়া। প্রায় ১৬ বছর ধরে চলে আসা এই রীতি এখন এলাকার অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
শতবর্ষের পুরনো মনসা পুজোর ইতিহাস
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চরব্রহ্মনগর সংলগ্ন এলাকায় মনসা পুজোর প্রচলন বহু পুরনো। একসময় সাপের উপদ্রব এবং সাপের কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় স্থানীয় পরিবারগুলিতে দেবী মনসার আরাধনা করা হত।প্রথমে পারিবারিকভাবে পালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সেই পুজো বৃহত্তর রূপ নেয়। প্রায় ১৬ বছর আগে এটি সার্বজনীন বারোয়ারি পুজোয় পরিণত হয়।
কেন ভেলায় ভাসানো হয় বেহুলা-লখিন্দরকে?
এই প্রথার সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দরের আখ্যানের। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, সাপের কামড়ে লখিন্দরের মৃত্যু হলে তাঁকে নিয়ে কলার ভেলায় যাত্রা করেন বেহুলা। স্বামীর প্রাণ ফেরানোর উদ্দেশ্যে তাঁর সেই দীর্ঘ যাত্রা বাংলা লোকসাহিত্যে অত্যন্ত পরিচিত।চরব্রহ্মনগরের উদ্যোক্তারা সেই পৌরাণিক আখ্যানকেই প্রতীকীভাবে তুলে ধরেন। মনসা দেবীর বিসর্জনের পাশাপাশি বেহুলা-লখিন্দরের প্রতিকৃতিও কলার ভেলায় তুলে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
অলৌকিক কোনও ঘটনা নয়, পুরাণকে জীবন্ত করার প্রয়াস
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, এই রীতির পিছনে কোনও অলৌকিক স্বপ্নাদেশের বিষয় নেই। বরং দেবী মনসার মাহাত্ম্য এবং মনসামঙ্গলের জনপ্রিয় কাহিনিকে মানুষের সামনে জীবন্ত করে তোলার ভাবনা থেকেই এই আয়োজনের সূচনা।এলাকাটি গঙ্গার তীরে হওয়ায় জলপথে এই প্রতীকী আয়োজন করাও সম্ভব হয়েছে।
এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান মানুষ
বাংলার বিভিন্ন জায়গায় মনসা পুজো ও মনসা মেলার আয়োজন হলেও কলার ভেলায় বেহুলা-লখিন্দরের প্রতিকৃতি ভাসানোর এমন রীতি যথেষ্ট ব্যতিক্রমীপাঁচ দিনের মেলা এবং বিসর্জনের এই বিশেষ আয়োজন দেখতে প্রতি বছরই চরব্রহ্মনগরে স্থানীয় মানুষ ও ভক্তদের ভিড় জমে। ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য-ঐতিহ্যেরও এক অনন্য প্রকাশ হয়ে উঠেছে এই অনুষ্ঠান।
নদিয়ার নবদ্বীপের চরব্রহ্মনগরে মনসা পুজোর বিসর্জন ঘিরে রয়েছে এক অভিনব ঐতিহ্য। প্রায় ১৬ বছর ধরে কলাগাছের তৈরি ভেলায় বেহুলা-লখিন্দরের প্রতিকৃতি গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, স্বামীর নিথর দেহ নিয়ে জলে ভেসে চলেছেন বেহুলা। মনসামঙ্গল কাব্যের সেই চেনা আখ্যানকেই প্রতি বছর বাস্তবের রূপ দেন স্থানীয়রা।











