মেয়েরা ট্রাক চালায় না—সমাজের এই চিরাচরিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন হিমাচল প্রদেশের নেহা ঠাকুর। ছোটবেলা থেকেই বাবার ট্রাক চালানোর দৃশ্য দেখে মুগ্ধ ছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নই একদিন তাঁকে নিয়ে যায় ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ের পিছনে। পরিবার, সমাজ এবং নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আজ তিনি শুধু একজন সফল ট্রাকচালক নন, বহু নারীর কাছে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

বাবার ট্রাকেই জন্ম নেয় স্বপ্নের বীজ
হিমাচল প্রদেশের মান্ডি জেলার সারকাঘাটের বাসিন্দা নেহা ঠাকুরের জীবনের গল্প শুরু হয় পাহাড়ি রাস্তার ধুলো-মাটি আর ট্রাকের ইঞ্জিনের গর্জনের মধ্যে। তাঁর বাবা রাজেশ ঠাকুর দীর্ঘদিনের পেশাদার ট্রাকচালক। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন পথে যাতায়াত করতে করতেই ট্রাক চালানোর প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় নেহার।তিনি প্রায়ই বাবাকে দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় দক্ষতার সঙ্গে ট্রাক চালাতে দেখতেন। তখন থেকেই নিজের মনেও একদিন সেই স্টিয়ারিং ধরার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।
সমাজের কটাক্ষকে উপেক্ষা করে গোপনে প্রশিক্ষণ
স্বপ্ন থাকলেও পথটা মোটেও সহজ ছিল না। চারপাশের মানুষ বারবার তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ট্রাক চালানো নাকি শুধুই পুরুষদের কাজ। কিন্তু সেই কথায় থেমে থাকেননি নেহা।নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি পরিবারকে না জানিয়েই ট্রাক চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। সুযোগ পেলেই অনুশীলন করতেন। পরবর্তীতে ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স অর্জন করে পেশাদার ট্রাকচালক হিসেবে নিজের যাত্রা শুরু করেন।

এয়ার হোস্টেস নয়, বেছে নিলেন ট্রাকের স্টিয়ারিং
স্নাতক পাশ করার পর নেহা এয়ার হোস্টেস হওয়ার প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। কিন্তু চাকচিক্যময় সেই পেশার বদলে তাঁর মন টানত রাস্তায়, ট্রাকের কেবিনে এবং দীর্ঘ সফরের রোমাঞ্চে।তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের সত্যিকারের ভালোবাসা লুকিয়ে রয়েছে ট্রাক চালানোর মধ্যেই। তাই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পেশাকে নিজের ভবিষ্যৎ হিসেবে বেছে নেন।
১৬ টনের ট্রাক নিয়ে পাড়ি দেন দুর্গম পাহাড়ি পথ
বর্তমানে নেহা ১৬ টনের একটি ট্রাক চালিয়ে হিমাচল ও অন্যান্য রাজ্যের বিভিন্ন রুটে নির্মাণ সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য পরিবহণ করেন। কখনও কখনও দিনে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে হয় তাঁকে।সংকীর্ণ পাহাড়ি রাস্তা, ভূমিধসের আশঙ্কা, কুয়াশা কিংবা ভারী বৃষ্টি—সব প্রতিকূলতাকেই পেশার অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, রাস্তা কাউকে লিঙ্গের ভিত্তিতে বিচার করে না, বিচার করে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসকে।
ট্রাকচালক থেকে জনপ্রিয় ইউটিউব ভ্লগার
শুধু ট্রাক চালানোতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি নেহা। বোনের পরামর্শে নিজের যাত্রার অভিজ্ঞতা ভিডিও আকারে তুলে ধরতে শুরু করেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।ধীরে ধীরে তাঁর ইউটিউব চ্যানেল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে লক্ষাধিক দর্শক তাঁর ভিডিও দেখেন। ট্রাকচালকের বাস্তব জীবন, সড়ক নিরাপত্তা, পাহাড়ি পথে ড্রাইভিং এবং পেশার নানা অজানা দিক তুলে ধরেন তিনি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই পেশা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

বহু নারীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম নেহা
নেহার সাফল্যের প্রভাব শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গল্প শুনে অনেক তরুণী ভারী যানবাহন চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। পুরুষ-প্রধান পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।নেহার বিশ্বাস, কোনও পেশার সঙ্গে নারী বা পুরুষের পরিচয় জড়িয়ে থাকা উচিত নয়। যোগ্যতা এবং পরিশ্রমই হওয়া উচিত সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি।

পুরুষ-প্রধান পেশায় নিজের জায়গা তৈরি করে নজির গড়েছেন হিমাচলের তরুণী নেহা ঠাকুর। একসময় সমাজের কটাক্ষ শুনতে হলেও আজ তিনি ১৬ টনের ট্রাক চালিয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথে পণ্য পৌঁছে দেন। একইসঙ্গে ইউটিউব ভ্লগার হিসেবেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প এখন বহু তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা।













