ভারতের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা। জুরিখে অনুষ্ঠিত International Monetary Fund এবং Swiss National Bank-এর দ্বাদশ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে তিনি বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
তিনি জানান, সরকার এখন পর্যন্ত ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চাপ ক্রমাগত বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত রাখা কঠিন হতে পারে।
আরবিআই গভর্নরের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে ওঠানামা সত্ত্বেও ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এর জন্য কর কাঠামোয় সমন্বয় এবং সীমিত পরিসরে ভর্তুকির মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে ভারত রাজকোষীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখে আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। মহামারির সময় যা ৯ শতাংশের বেশি হয়ে গিয়েছিল, তা বর্তমানে প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে বৈশ্বিক তেল সংকট এই স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
![]()
সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, ভারতের অর্থনীতির জন্য পশ্চিম এশিয়া কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ভারতের আমদানি-রপ্তানির প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের প্রায় ৪০ শতাংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। সার আমদানির ক্ষেত্রেও ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ নির্ভরতা পশ্চিম এশিয়ার উপর রয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৬০ শতাংশও এই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি ভারতের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
অপরিশোধিত তেলের দামের বৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করেন আরবিআই গভর্নর। ভারতে ভোক্তা মূল্য সূচকে খাদ্যপণ্যের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ হওয়ায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার ফলে খাদ্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়।
সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে সরবরাহভিত্তিক ধাক্কা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ককে সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে। বৈশ্বিক উত্তেজনা এবং তেল সরবরাহে বাধা আরও বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানির দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরও পড়তে পারে।












