স্বাভাবিক হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে দুই পায়ে পা ফেলা হয়। কিন্তু কখনও যদি দেখা যায়, হাঁটার সময় শরীরের উপরিভাগ এদিক-ওদিক দুলছে এবং কোমরও সেই অনুযায়ী একদিকে নেমে যাচ্ছে, তাহলে বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি। দেখতে অনেকটা হাঁস বা পেঙ্গুইনের মতো হাঁটার এই ভঙ্গিই পরিচিত ‘ওয়াডলিং গেইট’ নামে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিজে কোনও আলাদা রোগ নয়; বরং শরীরের অন্য কোনও সমস্যা বা পেশির দুর্বলতার লক্ষণ হতে পারে।
কী এই Waddling Gait?
‘Waddling Gait’ বলতে এমন এক ধরনের হাঁটার ধরনকে বোঝানো হয়, যেখানে হাঁটার সময় শরীরের উপরের অংশ এক পাশ থেকে অন্য পাশে দুলতে থাকে। একইসঙ্গে শ্রোণী বা কোমরের অংশও স্বাভাবিকভাবে স্থির না থেকে একদিকে নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ে।আইএলএস, দমদম হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডক্টর মৌমিতা বাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণত পেলভিক গার্ডল বা শ্রোণিদেশের পেশিগুলি দুর্বল বা আক্রান্ত হলে এই ধরনের হাঁটার ভঙ্গি দেখা দিতে পারে।
মহিলাদের ক্ষেত্রে কখন দেখা দিতে পারে?
গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়েও কিছু মহিলার হাঁটার ধরনে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে সেটিকে স্বাভাবিক পরিবর্তন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।এর পাশাপাশি হিপ ডিসপ্লেসিয়া এবং পেলভিক গার্ডলের পেশি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গেও Waddling Gait-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। মাসকুলার ডিস্ট্রফি, ইনফ্ল্যামেটরি মায়োপ্যাথি এবং স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি বা SMA-এর মতো পরিস্থিতিতেও এমন হাঁটার ধরন দেখা দিতে পারে।
পেশি দুর্বল হলেই কেন শরীর দুলে হাঁটে?
হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে কোমর ও শ্রোণিদেশের বেশ কিছু পেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এর মধ্যে Gluteus Medius এবং Gluteus Minimus উল্লেখযোগ্য।এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর সময় এই পেশিগুলি শ্রোণীকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু পেশিগুলি দুর্বল হয়ে গেলে শ্রোণী বিপরীত দিকে হেলে যেতে পারে। ফলে হাঁটার প্রতিটি ধাপে শরীরকে ভারসাম্য বজায় রাখতে এদিক-ওদিক দুলতে হয়। তখনই হাঁটার মধ্যে ‘ওয়াডলিং’-এর মতো ভঙ্গি তৈরি হয়।বিশেষ করে মাসকুলার ডিস্ট্রফির ক্ষেত্রে শ্রোণী ও নিতম্বের আশপাশের পেশির ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া এই ধরনের হাঁটার অন্যতম কারণ হতে পারে।
শুধু হাঁটার ধরন দেখেই রোগ নির্ণয় নয়
Waddling Gait দেখা গেলেই নির্দিষ্ট কোনও রোগ হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া উচিত নয়। এর পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে তা জানতে চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন।প্রয়োজন অনুযায়ী CPK, EMG এবং NCV-এর মতো পরীক্ষাও করা হতে পারে। রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই চিকিৎসক পরবর্তী পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
Waddling Gait-এর চিকিৎসা মূলত এর কারণের উপর নির্ভর করে। কারণ এই হাঁটার ধরন নিজে কোনও আলাদা রোগ নয়, বরং একটি উপসর্গ।
চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হল—
দুর্বল পেশির শক্তি বাড়ানো
শরীরের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা উন্নত করা
হাঁটাচলার সক্ষমতা বাড়ানো
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো
যে শারীরিক সমস্যার কারণে এই লক্ষণ তৈরি হয়েছে, তার চিকিৎসা করা
এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়ক সরঞ্জাম, অকুপেশনাল থেরাপি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণেরও প্রয়োজন হতে পারে।
![]()
বাড়িতে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?
এই ধরনের হাঁটার সমস্যা থাকলে নিজের ইচ্ছায় কঠিন বা অতিরিক্ত ব্যায়াম শুরু না করাই ভালো। ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা ও নিয়মিত ব্যায়াম করা যেতে পারে।
পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—
সুষম খাবার: পর্যাপ্ত প্রোটিন ও সামগ্রিকভাবে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার দিকে নজর দিন।
ভিটামিন D ও ক্যালসিয়াম: ঘাটতির আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পরবর্তী ব্যবস্থা নিন। নিজের ইচ্ছায় সাপ্লিমেন্ট শুরু না করাই ভালো।
একটানা বসে থাকবেন না: দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় না থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে হাঁটাচলা বা নড়াচড়া করুন।
ব্যায়ামের সময় অবলম্বন নিন: ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হলে শক্ত চেয়ার বা নিরাপদ কোনও অবলম্বনের সাহায্যে ব্যায়াম করুন।
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমান: মেঝেতে আলগা কার্পেট, ছড়িয়ে থাকা জিনিস বা অন্য কোনও বাধা রাখবেন না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
হাঁটার ধরনে নতুন করে এমন পরিবর্তন দেখা দিলে, সমস্যা ক্রমশ বাড়লে, ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হলে বা হাঁটার সময় বারবার পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে শরীর দুলিয়ে হাঁটার প্রবণতা থাকলে শুধু ব্যায়াম করে বিষয়টি সামলানোর চেষ্টা না করে কারণটি খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
হাঁটার সময় শরীর এক দিক থেকে অন্য দিকে দুলছে, কোমরও ঠিকভাবে স্থির থাকছে না? এই ধরনের হাঁটার ভঙ্গিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Waddling Gait বলা হয়। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে সাময়িকভাবে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে হিপ ডিসপ্লেসিয়া, পেলভিক গার্ডলের পেশির দুর্বলতা, মাসকুলার ডিস্ট্রফি, ইনফ্ল্যামেটরি মায়োপ্যাথি বা SMA-এর মতো সমস্যার সঙ্গেও এর যোগ থাকতে পারে। কীভাবে এই সমস্যা চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়, জানুন।













