ছোট পাথর ডুবে যায়, কিন্তু হাজার টনের জাহাজ ভাসে কেন? ২২০০ বছর আগের বিজ্ঞানের সূত্রেই লুকিয়ে রহস্য

ছোট পাথর জলে ডুবে যায় কিন্তু হাজার টনের জাহাজ ভেসে থাকে কেন? আর্কিমিডিসের নীতি, উচ্ছ্বাস বল ও ঘনত্বের বিজ্ঞানে লুকিয়ে রয়েছে এর রহস্য—সহজ ভাষায় জানুন।

আমরা প্রতিদিনই জলের মধ্যে বস্তু ডুবতে বা ভাসতে দেখি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, একটি ছোট পাথর যেখানে ডুবে যায়, সেখানে হাজার টনের বিশাল জাহাজ কীভাবে জলের উপর ভাসে? এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—আর্কিমিডিসের নীতি। প্রায় ২২০০ বছর আগে আবিষ্কৃত এই তত্ত্বই আজও জাহাজ নির্মাণের মূল ভিত্তি।

আর্কিমিডিসের নীতি: ভাসমানতার মূল রহস্য

প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী Archimedes আবিষ্কার করেছিলেন যে কোনও বস্তু যদি জলে বা অন্য কোনও তরলে আংশিক বা সম্পূর্ণ ডুবে যায়, তাহলে সেই তরল বস্তুটিকে উপরের দিকে একটি বল প্রয়োগ করে। এই বলকে বলা হয় ‘উচ্ছ্বাস বল’। এই উচ্ছ্বাস বলের পরিমাণ ঠিক সমান হয় বস্তুটি যে পরিমাণ জল স্থানচ্যুত করে তার ওজনের সঙ্গে।

F_b = rho g V

(এখানে 

𝐹

𝑏

F

b

 হলো উচ্ছ্বাস বল,

𝑟

𝑜

rho তরলের ঘনত্ব, 

𝑔

g মহাকর্ষজ ত্বরণ এবং 

𝑉

V স্থানচ্যুত তরলের আয়তন।)

জলের স্থানচ্যুতি: কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া

ধরা যাক একটি পাত্রে জল ভর্তি করা হয়েছে। এখন সেই জলে যদি কোনও বস্তু রাখা হয়, তাহলে বস্তুটি কিছু পরিমাণ জল সরিয়ে দেয়। এই সরিয়ে দেওয়া জলকেই বলা হয় স্থানচ্যুত জল। সেই স্থানচ্যুত জলের ওজনের সমান একটি উর্ধ্বমুখী চাপ বস্তুটির উপর কাজ করে। যদি এই চাপ বস্তুর ওজনের সমান বা বেশি হয়, তাহলে বস্তুটি ভেসে থাকে।

জাহাজের নকশা: ফাঁপা কাঠামোর বড় ভূমিকা

জাহাজের নিচের অংশ বা ‘হাল’ সাধারণত বড় এবং ফাঁপা হয়। এর ভিতরে অনেকটা খালি জায়গা থাকে, যেখানে বাতাস ও অন্যান্য উপকরণ থাকে। ফলে জাহাজের মোট আয়তন অনেক বড় হলেও এর গড় ঘনত্ব জলের তুলনায় কম হয়ে যায়। এই কারণেই জাহাজ প্রচুর পরিমাণে জল স্থানচ্যুত করতে পারে এবং শক্তিশালী উচ্ছ্বাস বল তৈরি হয়।

পাথর ডোবে কেন, জাহাজ ভাসে কেন?

একটি ছোট পাথর জলে ফেললে খুব কম জল স্থানচ্যুত হয়। ফলে জলের তৈরি উচ্ছ্বাস বল পাথরের ওজনের চেয়ে কম হয়—তাই পাথর ডুবে যায়। কিন্তু একটি জাহাজের আকার বড় হওয়ায় এটি অনেক বেশি জল স্থানচ্যুত করে। ফলে জলের উচ্ছ্বাস বল জাহাজের ওজনের সমান বা বেশি হয়ে যায়—এ কারণেই জাহাজ ভেসে থাকে।

আধুনিক প্রযুক্তি: আরও নিরাপদ জাহাজ নির্মাণ

বর্তমানে জাহাজ নির্মাণে উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যাতে জাহাজের নকশা এমনভাবে তৈরি হয় যে সর্বাধিক জল স্থানচ্যুত করতে পারে। পাশাপাশি ‘প্লিমসোল লাইন’ ব্যবহার করে নির্ধারণ করা হয় একটি জাহাজ কতটা বোঝা বহন করতে পারবে। এছাড়া ব্যালাস্ট ট্যাঙ্কে জল ভরে জাহাজের ভারসাম্যও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

জলে ছোট পাথর ফেললে তা মুহূর্তেই তলিয়ে যায়, কিন্তু হাজার হাজার টন ওজনের বিশাল জাহাজ দিব্যি ভেসে থাকে। এই আশ্চর্য ঘটনাটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী Archimedes। তাঁর আবিষ্কৃত ‘আর্কিমিডিসের নীতি’ এবং উচ্ছ্বাস বলের বিজ্ঞানই বুঝিয়ে দেয় কীভাবে এত বড় জাহাজ সমুদ্রের উপর ভেসে থাকতে পারে।

 

Leave a comment