শিশুরা জন্মের পরই কেন কাঁদে? হাসতে দেরি হয় কেন? নবজাতকের রহস্য উন্মোচন করল বিজ্ঞান

নবজাতক জন্মের সঙ্গেই কেন কাঁদে এবং হাসির প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে সপ্তাহ কেন লাগে—বিজ্ঞান বলছে প্রথম শ্বাস, তাপমাত্রার ধাক্কা ও স্নায়বিক বিকাশই আসল কারণ। জানুন শিশুর জন্মমুহূর্তের বিজ্ঞান।

জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই নবজাতকের কান্না শোনা যায়—এটা যেন জীবনের প্রথম ঘোষণা। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই কান্নার নেপথ্যে আবেগ নয়, কাজ করে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন। গর্ভের উষ্ণ, তরলভর্তি নিরাপদ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে ঠান্ডা আলো–হাওয়া–শব্দের পৃথিবীতে আসতেই তার শরীর প্রথমবার সক্রিয় হয়। সেই ধাক্কা থেকেই শুরু কান্না। তবে হাসির অনুভূতি কেন পরে আসে? তার জবাবও দিয়েছে শিশুবিজ্ঞান।

প্রথম শ্বাসের ধাক্কা: ফুসফুসের ‘সিস্টেম অন’ সঙ্কেত

প্রায় নয় মাস মায়ের গর্ভে অ্যামনিওটিক তরলের মধ্যে থাকে ভ্রূণ। সেখানে ফুসফুসের ভিতর থাকে তরল, ফলে শ্বাস নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। জন্মমুহূর্তে হঠাৎ বাতাস প্রবেশ করে ফুসফুসে। এই গভীর প্রথম শ্বাসই শিশুকে কাঁদতে বাধ্য করে। কান্নাই সাহায্য করে অ্যালভিওলি নামের ক্ষুদ্র বায়ুথলি খুলে দিতে, যা শ্বাসযন্ত্রকে সম্পূর্ণ সক্রিয় করে।

তাপমাত্রা, আলো ও শব্দের ধাক্কায় উদ্ভাসিত প্রথম কান্না

গর্ভের স্থিতিশীল ৩৭°C উষ্ণ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে শিশুটি ঠান্ডা, আলো–ভরা, শব্দময় পরিবেশে আসে। এই আচমকা পরিবর্তন শরীরের স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। উজ্জ্বল আলো, মাধ্যাকর্ষণের স্পর্শ, বাতাসের হালকা চাপ—সব মিলিয়ে শরীর এই নতুন উত্তেজনাকে কান্নার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়।

ডাক্তাররা কেন চান শিশুটি জন্মেই কাঁদুক?

কান্না হচ্ছে শিশুর সুস্থতার প্রাথমিক সূচক। জন্মের পর অ্যাপগার স্কোরে শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস, রঙ, হৃদস্পন্দন—সব যাচাই করা হয়। কান্না শ্বাসযন্ত্রের সঠিক কাজের ইঙ্গিত দেয়। যদি কোনও শিশু সঙ্গে সঙ্গে না কাঁদে, তবে ডাক্তাররা তার পিঠে চাপড় দেন বা শ্বাসনালী পরিষ্কার করেন যাতে শ্বাসপ্রশ্বাস সক্রিয় হয়।

কান্না ছাড়া জন্ম—সম্ভব কি?

হ্যাঁ, বিরল হলেও সম্ভব। কিছু নবজাতক কান্না না করেও গভীর শ্বাস নেয় এবং সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। যদি ত্বক গোলাপি হয় ও শরীর সক্রিয় দেখা যায়, তবে এটি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে কান্না না হওয়া বিপদের সঙ্কেত, যেখানে সক্রিয় চিকিৎসা প্রয়োজন পড়ে।

জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কি কোনও শিশু হাসতে পারে? বিজ্ঞান বলছে—না!

বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানান, জন্মের সময় কোনও শিশুকে ‘হাসতে’ দেখা যায় না। হাসি হচ্ছে একটি স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া, যেখানে কর্টেক্স, মুখের পেশী এবং সামাজিক উদ্দীপনা একসঙ্গে কাজ করে। এই সমন্বয় তৈরি হতে জন্মের পরে কমপক্ষে ৪–৬ সপ্তাহ সময় লাগে। নবজাতকের মুখের যে ‘হাসির মতো’ অভিব্যক্তি দেখা যায়, তা আসলে রিফ্লেক্স, প্রকৃত হাসি নয়।

লোককাহিনি বনাম বিজ্ঞান

অনেক গল্পে জন্মেই হাসিমুখ শিশুর উল্লেখ থাকলেও, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মেডিক্যাল জার্নালে ‘কোয়াইট বার্থ’–এর ঘটনা আছে, যেখানে শিশু কাঁদেনি কিন্তু শ্বাস নিয়েছে। কয়েক মিনিট পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় শরীর স্থিতিশীল থাকলে এটি স্বাভাবিক।

নবজাতক জন্মের মুহূর্তে কাঁদে—এটাই স্বাভাবিক। কেন ঘটে এই কান্না? ব্যথা, ভয় না কি শরীরের নতুন সিস্টেম চালুর সঙ্কেত? গবেষকেরা জানান, প্রথম শ্বাস, তাপমাত্রার ধাক্কা ও স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার কারণেই ঘটে এই কান্না। তবে হাসি আসতে দেরি হয় স্নায়বিক পরিপক্কতার জন্য।

Leave a comment