এক দশক আগেও বাংলার বহু গ্রামে আকাশে চক্কর কাটতে দেখা যেত শকুনের ঝাঁক। মাঠের ধারে, বড় গাছের ডালে কিংবা মৃত পশুর দেহ ঘিরে তাদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। প্রশ্ন উঠছে—হঠাৎ করে গ্রামবাংলা থেকে কোথায় হারিয়ে গেল এই গুরুত্বপূর্ণ পাখি?
ডাইক্লোফেনাক: শকুন মৃত্যুর নীরব ঘাতক
পরিবেশবিদদের মতে, শকুন বিলুপ্তির সবচেয়ে বড় কারণ পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ব্যথানাশক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক। এই ওষুধ গবাদি পশুর শরীরে প্রয়োগের পর মৃতদেহে থেকে যায়। সেই মৃত পশুর মাংস খেলে শকুনের কিডনি বিকল হয়ে যায় এবং খুব দ্রুত তাদের মৃত্যু ঘটে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই এই ওষুধ শকুনের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
পরিবেশ ধ্বংসে নষ্ট আশ্রয়
শুধু ওষুধই নয়, পরিবেশের পরিবর্তনও শকুন হারিয়ে যাওয়ার বড় কারণ। গ্রামাঞ্চলে বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং খোলা মাঠ কমে যাওয়ার ফলে শকুনের নিরাপদ বাসা বাঁধার জায়গা প্রায় নেই বললেই চলে। আশ্রয় না থাকায় তারা বংশবিস্তার করতে পারছে না, ফলে সংখ্যাও দ্রুত কমছে।
খাদ্য সংকটে দুর্বল শকুন
আধুনিক ব্যবস্থাপনায় এখন মৃত পশু দ্রুত মাটি চাপা দেওয়া বা অন্যভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। এতে পরিবেশ পরিষ্কার থাকলেও শকুনের প্রাকৃতিক খাদ্যের জোগান কমে গেছে। খাদ্যের অভাবে অনেক শকুন দুর্বল হয়ে পড়ছে, কেউ কেউ আবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
শকুন কমায় বাড়ছে রোগের ঝুঁকি
শকুন প্রকৃতির নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মৃত পশুর দেহ দ্রুত পরিষ্কার করে তারা পরিবেশকে রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করে। কিন্তু শকুন কমে যাওয়ায় বহু এলাকায় মৃত পশুর দেহ দীর্ঘদিন পড়ে থাকছে। এর ফলে সংক্রমণ, ব্যাকটেরিয়া ও নানা রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যেও।
সংরক্ষণ উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
বর্তমানে শকুন সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তা এখনও যথেষ্ট নয়। নিরাপদ পশু ওষুধ ব্যবহার, শকুন সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা এবং গ্রামবাসীদের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এই পাখিকে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
এক সময় গ্রামবাংলার পরিচিত দৃশ্য ছিল শকুন। কিন্তু আজ তাদের দেখা প্রায় নেই। পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্ষতিকর ওষুধ, পরিবেশ ধ্বংস এবং খাদ্য সংকট—এই তিন কারণেই মূলত গ্রামাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শকুন।













