কোথাও বিশাল মন্দির, কোথাও সোনার গয়নায় সজ্জিত দেবীমূর্তি—কিন্তু বারাসতের ডাকাত কালীবাড়ির ছবি একেবারেই আলাদা। এখানে নেই কোনও প্রচলিত প্রতিমা, নেই বড়সড় গর্ভগৃহ কিংবা মাথার উপর পাকা ছাদ। প্রাচীন এক অশ্বত্থ গাছই ভক্তদের কাছে মা কালীর প্রতীক। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার লোককথায় পরিচিত রঘু ডাকাতের স্মৃতি। ভয়, রহস্য আর গভীর বিশ্বাসের মিশেলে আজও এই মন্দির টানে বহু মানুষকে।
![]()
বারাসতের কোথায় রয়েছে ডাকাত কালীবাড়ি?
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডে, কাঠোর রোডের কাছে অবস্থিত এই প্রাচীন কালীপুজোর স্থান। স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরটির ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। জেলার প্রাচীন কালীমন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিচিত ডাকাত কালীবাড়ি।তবে অন্য মন্দিরের মতো এখানে চোখে পড়বে না কোনও সুসজ্জিত মন্দির ভবন। মাথার উপর ছাদ হিসেবে রয়েছে প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের ডালপালা ও শিকড়। গাছের গোড়াতেই ভক্তরা পুজো দেন।
প্রতিমা নয়, অশ্বত্থ গাছেই পূজিত হন মা কালী
ডাকাত কালীবাড়ির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দেবীর কোনও প্রচলিত মূর্তি নেই। প্রাচীন অশ্বত্থ গাছটিকেই মা কালীর প্রতীক হিসেবে মানেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভক্তরা।পুজো দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পুরোহিতের উপর নির্ভর করতে হয় না। ভক্তরা নিজেরাই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে মনের ইচ্ছার কথা জানান। প্রণাম করার পর ধূপকাঠি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, আন্তরিকভাবে মায়ের কাছে কিছু চাইলে মনস্কামনা পূরণ হয়। এই বিশ্বাসের টানেই দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এখানে আসেন।
রঘু ডাকাতের সঙ্গে কীভাবে জড়াল মন্দিরের নাম?
এই কালীবাড়ির পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার লোককথার অন্যতম আলোচিত চরিত্র রঘু ডাকাতের নাম। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একসময় ডাকাতি করতে বেরনোর আগে রঘু ডাকাত ও তাঁর সঙ্গীরা এই স্থানে পুজো দিতেন। ডাকাতি সেরে ফিরে এসেও তাঁরা নাকি এখানে পুজো দিতে আসতেন।লোকমুখে আরও প্রচলিত রয়েছে, একসময় এই এলাকাই ছিল তাঁদের আস্তানা। যদিও এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা আলাদাভাবে প্রমাণিত নয়, তবু রঘু ডাকাতের স্মৃতির সঙ্গে মন্দিরটির নাম আজও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই জায়গাটি পরিচিত হয়েছে ‘ডাকাত কালীবাড়ি’ নামে।
![]()
৪০০ বছরের পুরোনো গাছ ঘিরেই ভক্তদের বিশ্বাস
স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরের কেন্দ্রে থাকা অশ্বত্থ গাছটির বয়স আনুমানিক ৪০০ বছর। গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়েই ভক্তরা প্রার্থনা করেন। আলাদা প্রতিমা বা গর্ভগৃহ না থাকলেও এই গাছকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় পরম্পরা।একসময় এলাকাটি নিয়ে মানুষের মনে ভয় কাজ করত বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। সময়ের সঙ্গে সেই ছবির পরিবর্তন হয়েছে। এখন বহু মানুষ এখানে আসেন পুজো দিতে এবং নিজের মনস্কামনা জানাতে। পুরোনো লোককথার পাশাপাশি ভক্তদের বিশ্বাসই এই স্থানকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
মন্দিরের দেখভাল হয় কীভাবে?
বারাসত পুরসভার উদ্যোগে মন্দির চত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। একজন সেবায়েত মন্দিরের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি সকালে গেট খুলে দেন এবং বিকেলে বন্ধ করে দেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ভক্তরা মন্দিরে প্রবেশ করে পুজো দিতে পারেন।তবে মন্দিরের বর্তমান পরিকাঠামো নিয়ে স্থানীয়দের একাংশের উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি ধর্মীয় স্থানের আরও ভালো রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে মন্দিরের উপরে পাকা ছাদ না থাকায় সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
![]()
উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের কাঠোর রোডে রয়েছে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ডাকাত কালীবাড়ি। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত রঘু ডাকাতের নাম। এখানে কোনও প্রচলিত কালীমূর্তি নেই। প্রাচীন অশ্বত্থ গাছকেই দেবীর প্রতীক হিসেবে পুজো করেন ভক্তরা।










