বাইক চালানোর সময় মাথার সুরক্ষার জন্য হেলমেট অপরিহার্য। কিন্তু নতুন হেলমেট কেনার পর কত বছর সেটি ব্যবহার করা নিরাপদ, তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। বাইরে থেকে হেলমেট একেবারে নতুনের মতো দেখালেও ভিতরের সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে দুর্ঘটনার সময় মাথায় গুরুতর আঘাত লাগার আশঙ্কা বাড়ে। তাহলে কতদিন অন্তর হেলমেট বদলানো উচিত? কোন লক্ষণ দেখলে বুঝবেন পুরনো হেলমেট আর নিরাপদ নয়?
হেলমেটেরও কি নির্দিষ্ট ব্যবহারকাল রয়েছে?
হ্যাঁ, হেলমেটেরও নির্দিষ্ট ব্যবহারকাল রয়েছে। তবে খাবার বা ওষুধের মতো সব হেলমেটের জন্য একই রকম নির্দিষ্ট এক্সপায়ারি ডেট থাকে না। ব্যবহারের ধরন, সংরক্ষণের পরিবেশ, উপকরণের মান এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকার উপর নির্ভর করে এর কার্যকারিতা।অনেক হেলমেট প্রস্তুতকারী সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ থেকে ৫ বছর পর হেলমেট বদলে ফেলার পরামর্শ দেন। তবে এটি কোনও সর্বজনীন নিয়ম নয়। তাই নিজের হেলমেটের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের দেওয়া নির্দেশিকা অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত।
উৎপাদনের তারিখও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হেলমেট কেনার সময় শুধু দাম বা ডিজাইন দেখলেই চলবে না। উৎপাদনের তারিখও পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ দোকানে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা হেলমেট কিনলেও তার উপকরণের বয়স ইতিমধ্যেই বেড়ে যেতে পারে।জাপানের পরিচিত হেলমেট প্রস্তুতকারী সংস্থা Arai এবং Shoei-ও হেলমেটের বয়স ও নিয়মিত পরীক্ষা করার উপর গুরুত্ব দেয়। Arai-এর নির্দেশিকায় উৎপাদনের সাত বছর পর হেলমেটের ব্যবহার ও ওয়ারেন্টি সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সময়সীমাকে অন্য সব ব্র্যান্ডের জন্য একই নিয়ম বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বাইরে ঠিক থাকলেও ভিতরের EPS ফোম নষ্ট হতে পারে
অনেকের প্রশ্ন, হেলমেটের বাইরের অংশে কোনও ফাটল বা ভাঙা দাগ না থাকলে সেটি বদলানোর প্রয়োজন কেন? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে হেলমেটের ভিতরের সুরক্ষাব্যবস্থায়।হেলমেটের ভিতরে থার্মোকলের মতো দেখতে একটি বিশেষ স্তর থাকে, যাকে বলা হয় EPS ফোম লাইনার। দুর্ঘটনার সময় এই স্তর আঘাতের শক্তি শোষণ করে মাথায় পৌঁছনো ধাক্কা কমাতে সাহায্য করে।দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ঘাম, চুলের তেল, ধুলোবালি ও আর্দ্রতার প্রভাব পড়তে পারে হেলমেটের ভিতরের অংশে। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরম, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এবং ভুলভাবে সংরক্ষণের কারণে বাইরের শেল ও ভিতরের প্যাডিংয়ের অবস্থাও খারাপ হতে পারে। ফলে বাইরে থেকে অক্ষত মনে হলেও হেলমেটের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
কোন পরিস্থিতিতে বয়সের আগেই হেলমেট বদলাবেন?
হেলমেটের বয়স ৩ বা ৫ বছর না হলেও কয়েকটি পরিস্থিতিতে সেটি বদলে ফেলা জরুরি।
- দুর্ঘটনায় পড়লে: হেলমেট পরে দুর্ঘটনার শিকার হলে সেটি বদলে ফেলুন। বাইরে থেকে ফাটল না দেখা গেলেও ভিতরের EPS ফোম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- জোরে মাটিতে পড়ে গেলে: উঁচু থেকে কংক্রিটের মেঝেতে জোরে পড়লে ভিতরের সুরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতি হতে পারে। সন্দেহ থাকলে নতুন হেলমেট ব্যবহার করাই নিরাপদ।
- ফিটিং ঢিলা হয়ে গেলে: মাথায় পরার পর হেলমেট সহজেই নড়ে গেলে বা আগের মতো আঁটসাঁট না থাকলে সেটি পরীক্ষা করুন।
- চিন স্ট্র্যাপ নষ্ট হলে: হেলমেটের স্ট্র্যাপ বা আটকানোর ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ না করলে দুর্ঘটনার সময় সেটি মাথা থেকে সরে যেতে পারে।
- ভিতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে: প্যাডিং ছিঁড়ে গেলে, ফোমে ক্ষতি দেখা দিলে বা ভিতরের অংশ আলগা হয়ে গেলে হেলমেট বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন হেলমেট কেনার সময় কী কী দেখবেন?
নতুন হেলমেট কেনার সময় অবশ্যই ISI চিহ্ন এবং প্রযোজ্য BIS মান রয়েছে কি না দেখে নিন। পাশাপাশি উৎপাদনের তারিখ, প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা এবং হেলমেটের ফিটিং পরীক্ষা করুন।হেলমেট মাথায় পরে চিন স্ট্র্যাপ ঠিকমতো আটকে দেখতে হবে। মাথা নাড়ালে সেটি যেন সহজে সরে না যায়। খুব ঢিলেঢালা বা অতিরিক্ত আঁটসাঁট হেলমেট ব্যবহার করা উচিত নয়। মনে রাখবেন, শুধু দামি বা দেখতে সুন্দর হলেই হেলমেট নিরাপদ হয় না—সঠিক মান এবং সঠিক ফিটিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাইক বা স্কুটার চালানোর সময় হেলমেট পরা শুধু ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয় নয়, এটি জীবনরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা সরঞ্জাম। কিন্তু অনেকেই একটি হেলমেট বছরের পর বছর ব্যবহার করেন। অথচ ব্যবহারের সময়, পরিবেশ এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকার উপর নির্ভর করে হেলমেটের কার্যকারিতা কমতে পারে। সাধারণভাবে অনেক প্রস্তুতকারক ৩ থেকে ৫ বছর ব্যবহারের পর হেলমেট বদলানোর পরামর্শ দেন। দুর্ঘটনায় পড়লে বা হেলমেটের ভিতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার আগেই বদলানো জরুরি।













