উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ শুরুতে এর কোনও স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন BP নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও রক্তনালীর উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য কিছু বদল এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
খাবারে নুন ও সোডিয়াম কমান
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই নজর দিতে হবে সোডিয়াম গ্রহণের দিকে। রান্নায় অতিরিক্ত নুন ব্যবহার না করার পাশাপাশি খাবারের সঙ্গে আলাদা করে কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা কমানো ভালো।শুধু রান্নার নুনই নয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, আচার, পাঁপড়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং বিভিন্ন সসেও প্রচুর সোডিয়াম থাকতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এ ধরনের খাবার যতটা সম্ভব কম রাখাই উপকারী।
পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার রাখুন
সোডিয়ামের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পটাশিয়াম রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কলা, পালং শাক, টমেটো, ডাল, বিনস এবং অন্যান্য ফল ও সবজিতে পটাশিয়াম পাওয়া যায়।তবে কিডনির সমস্যা থাকলে বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খেলে অতিরিক্ত পটাশিয়াম গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পটাশিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা বিশেষ ডায়েট শুরু করা উচিত নয়।উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ফল, সবজি, গোটা শস্য এবং কম চর্বিযুক্ত খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া DASH ধরনের খাদ্যাভ্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ফাইবার বাড়ান, প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশ রাখা শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। সাদা ময়দার তৈরি খাবারের পরিবর্তে আটার রুটি, ওটস, ডালিয়া এবং অন্যান্য গোটা শস্য বেছে নেওয়া যেতে পারে।এর পাশাপাশি মরসুমি ফল, শাকসবজি, ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন। আপেল, পেয়ারা, বেদানা, লেবু জাতীয় ফল এবং নানা ধরনের সবজি সুষম ডায়েটের অংশ হতে পারে।ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার শুধু খাদ্যতালিকাকে ভারসাম্যপূর্ণ করতেই সাহায্য করে না, বরং হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
অতিরিক্ত চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া ভালো। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, বেশি চিজ এবং তেলেভাজা খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।এর পরিবর্তে মাছ, চামড়া ছাড়া চিকেন, ডাল, ছোলা, রাজমা ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। রান্নায় তেলের পরিমাণও পরিমিত রাখা জরুরি।চা-কফিতে থাকা ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল হলে পরিমাণ কমানো যেতে পারে। অ্যালকোহল গ্রহণ করলে সেটিও সীমিত রাখা বা এড়িয়ে চলা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
শুধু ডায়েট নয়, জীবনযাপনেও বদল জরুরি
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম বা অন্য কোনও উপযুক্ত শরীরচর্চা অভ্যাস করা যেতে পারে।মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার দিকেও নজর দিতে হবে।
ওষুধ বন্ধ করবেন না
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া BP-এর ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধের উপর নির্ভর করলেই হয় না। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ট্রেস কমানোর অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নুন কমানো, পটাশিয়াম ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার মতো কিছু পরিবর্তন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আনা যেতে পারে।













