ফুসফুসের ক্যান্সার: ভারতে প্রতি বছর বেড়ে চলেছে ফুসফুসের ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা, যেখানে ধূমপান ছাড়াও বায়ুদূষণ, প্যাসিভ স্মোকিং ও জেনেটিক কারণ প্রধান ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগটি কখন, কোথায়, কীভাবে, কার মধ্যে এবং কেন ধরা পড়লে সেরে ওঠার সম্ভাবনা বেশি—তার মূল নির্ভরতা প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক স্ক্রিনিং ও দ্রুত চিকিৎসার ওপর। টাটা ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, দেরিতে ধরা পড়লে অস্ত্রোপচার ও নিরাময়ের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ কতটা জরুরি
চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রথম দিকের লক্ষণগুলি খুবই নীরব। তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা ওজন কমাকে সাধারণ সংক্রমণ ভেবে অনেকেই অবহেলা করেন। এই অবহেলাই রোগটিকে দ্রুত জটিল পর্যায়ে নিয়ে যায়।ভারতে নতুন ক্যান্সার আক্রান্তদের প্রায় ৬.৯% এবং ক্যান্সার-জনিত মৃত্যুর প্রায় ৯.৩% ফুসফুসের ক্যান্সার। তাই প্রাথমিক স্ক্রিনিংই জীবনরক্ষার প্রধান উপায় বলে জানিয়েছে SVICCAR।
কেন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা—কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে
আগে এই রোগকে শুধুমাত্র ধূমপানের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও পরিস্থিতি বদলেছে। এখন তরুণ, মহিলা এবং অধূমপায়ী রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বায়ুদূষণ, কর্মক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ, প্যাসিভ স্মোকিং, এবং জেনেটিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝুঁকি। গ্রামীণ অঞ্চলে কাঠ, কয়লা ও বায়োমাসে রান্নার ফলে ঘরের ভেতরের দূষণও বাড়তি বিপদ ডেকে আনছে।
স্ক্রিনিং কেন সীমিত—ভারতের বাস্তব চ্যালেঞ্জ
লো-ডোজ সিটি স্ক্যানিং উচ্চ ঝুঁকির ব্যক্তিদের মৃত্যুহার প্রায় ২০% কমায়। তবে ভারতে সংগঠিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট বিস্তৃত নয়। এর পিছনে পরিকাঠামোর অভাব, টিবি-র মতো রোগের কারণে ভুল রিপোর্টের সম্ভাবনা, এবং অধূমপায়ী রোগী বাড়ার মতো সমস্যা রয়েছে।৫০ বছরের বেশি বয়সী এবং দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীদের মধ্যে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হলে রোগ শনাক্তকরণ আরও দ্রুত সম্ভব হবে।
চিকিৎসায় বিপ্লব—টার্গেটেড থেরাপি থেকে ইমিউনোথেরাপি
গত দশকে সার্জারি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপির উন্নত ব্যবস্থায় রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।মলিকিউলার টেস্টিংয়ের মাধ্যমে রোগের জেনেটিক গঠন নির্ধারণ করে রোগীর জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়, যা প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদি জীবনমান বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে যেটি একসময় মৃত্যুর সমার্থক ছিল, আজ তা বহু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত দীর্ঘস্থায়ী রোগে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসকের সতর্কবার্তা—অবহেলা মানেই বিপদ
টাটা ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের সিনিয়র অনকোলজিস্ট ড. সৌরভ চট্টোপাধ্যায় সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন—“ফুসফুসের ক্যান্সারকে শুধু ধূমপানের রোগ ভাবলে চলবে না। অধূমপায়ী, তরুণ এবং মহিলাদের মধ্যে রোগ বাড়ছে। দূষণ, প্যাসিভ স্মোকিং এবং দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ উপসর্গ ঢেকে দেয়, ফলে রোগীরা দেরিতে আসেন—আর সেই দেরিটাই রোগকে জটিল করে তোলে।”
ভারতে ধূমপানের পাশাপাশি বায়ুদূষণ, জেনেটিক কারণ ও প্যাসিভ স্মোকিংয়ে দ্রুত বাড়ছে ফুসফুসের ক্যান্সার। চিকিৎসকদের মতে, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে নিরাময়ের সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। সচেতনতা, স্ক্রিনিং ও সময়মতো চিকিৎসাই মৃত্যুহার কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।













