পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের প্রভাব এবার দলের আর্থিক পরিচালনাতেও পড়েছে। দলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডেবিট-ফ্রিজ জারি থাকার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী তৃণমূল কংগ্রেস জুন ও জুলাই মাসের দফতর পরিচালনার খরচ মেটাতে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা চেয়েছে। দলটি সরাসরি ব্যাংক থেকে অর্থ তোলার পরিবর্তে কলকাতা হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল অফিসারের মাধ্যমে ওই অর্থ ছাড়ের আবেদন জানিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে স্পেশাল অফিসার তথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে চিঠি দিয়ে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা ছাড়ের আবেদন করা হয়েছে। দলীয় নিয়মিত পরিচালনা, প্রশাসনিক কাজকর্ম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য এই অর্থ চাওয়া হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টগুলির সীমিত ব্যবহারের অনুমতি দিলেও এর জন্য স্পেশাল অফিসারের নজরদারি বাধ্যতামূলক করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার পর দলের দৈনন্দিন খরচ চালানো নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই অ্যাকাউন্টগুলিতে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা জমা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দলের দাবি, অ্যাকাউন্টগুলিতে নিষেধাজ্ঞার কারণে কর্মীদের বেতন, প্রশাসনিক খরচ এবং অন্যান্য নিয়মিত পেমেন্ট প্রভাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে পৃথক পরিসংখ্যান তুলে ধরে দাবি করা হয়েছে, দলের কাছে এখনও প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা উপলব্ধ রয়েছে।
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার বিষয়টি তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সঙ্গে যুক্ত। দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধের মধ্যে বিদ্রোহী বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসের অভিযোগের পর পুলিশ দলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডেবিট-ফ্রিজ করে। মমতা গোষ্ঠী এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এর বিরোধিতা করে।
মামলা কলকাতা হাইকোর্টে পৌঁছালে আদালত অ্যাকাউন্টগুলি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার পরিবর্তে সীমিত পরিচালনার ব্যবস্থা করে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে স্পেশাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তাঁর নজরদারিতে ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজনীয় পেমেন্টের অনুমতি দেওয়া হয়। এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।
আদালতের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে যে কোনও দু’জনকে পেমেন্টের জন্য চেক স্পেশাল অফিসারের কাছে পেশ করতে হবে। স্পেশাল অফিসারের অনুমোদন ও কাউন্টার সাইনের পরেই ব্যাংক থেকে অর্থ তোলা যাবে। ফলে দলকে অ্যাকাউন্টগুলির ওপর সম্পূর্ণ স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়নি এবং প্রতিটি পেমেন্ট স্পেশাল অফিসারের মাধ্যমে নজরদারির আওতায় থাকবে।
হাইকোর্ট আরও স্পষ্ট করেছে, অ্যাকাউন্ট থেকে শুধুমাত্র দলের দৈনন্দিন পরিচালনা এবং আইনি মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় খরচ করা যাবে। অন্যান্য ধরনের খরচের অনুমতি না দেওয়ার জন্য স্পেশাল অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনেই মমতা গোষ্ঠী জুন ও জুলাই মাসের খরচ মেটাতে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা ছাড়ের আবেদন করেছে।
কর্মীদের বেতনের বিষয়টিও মামলায় উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল ২১৫ জন কর্মীর বেতন বকেয়া থাকার কথা জানিয়েছিলেন। দলের বক্তব্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় কর্মীদের বেতন দেওয়া এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ চালানো কঠিন হচ্ছে। অন্যদিকে, দলের কাছে উপলব্ধ অর্থের পরিমাণ নিয়ে কেন্দ্র পৃথক দাবি করেছে।
দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা বিপুল অর্থ নিয়ে এই বিরোধে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED-এর ভূমিকাও রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার দলীয় তহবিলের ওপর কেন্দ্রীয় সংস্থাটির নজর রয়েছে। তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়া এবং আদালতের নজরদারিতে সেগুলির সীমিত পরিচালনার বিষয়টি তাই দলীয় বিরোধের পাশাপাশি আর্থিক তদন্তের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
মমতা গোষ্ঠীর চাওয়া ৯০ লক্ষ টাকা ছাড়ের বিষয়ে এখন স্পেশাল অফিসারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আদালত যেহেতু খরচের ওপর নজরদারির দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছে, তাই চাওয়া অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হবে, সেটিও বিবেচ্য হবে। আদালতের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, নিয়মিত দলীয় পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় আইনি খরচকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার পুলিশি পদক্ষেপ নিয়েও কলকাতা হাইকোর্ট প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের সামনে জানানো হয়েছিল, ১৮ জুন FIR দায়ের করা হয় এবং পরের দিন ১৯ জুন তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডেবিট-ফ্রিজ করা হয়। আদালত প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্ন তোলে, এত দ্রুত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার জন্য যথেষ্ট ভিত্তি কী ছিল।
তবে অন্তর্বর্তী আদেশে কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কোন গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, তা নির্ধারণ করেনি। দলীয় কর্তৃত্ব নিয়ে দুই পক্ষের দাবি নিয়ে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছেও বিচারাধীন রয়েছে। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছে, অ্যাকাউন্টের সীমিত পরিচালনার অনুমতিকে কোনও একটি গোষ্ঠীকে দলের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থে দেখা যাবে না।
মমতা গোষ্ঠীর জন্য আদালতের এই ব্যবস্থা ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের সীমিত ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে প্রতিটি পেমেন্টে নজরদারি থাকায় দল নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে অর্থ তুলতে পারবে না। ৯০ লক্ষ টাকা চাওয়ার আবেদনও এই বিচারিক নজরদারির ব্যবস্থার অধীনেই করা হয়েছে।
বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি আর্থিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থ থাকা সত্ত্বেও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ থাকায় নিয়মিত খরচ প্রভাবিত হচ্ছে বলে দল দাবি করছে। জুন ও জুলাই মাসের খরচের জন্য প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা চাওয়ার আবেদন সেই ব্যবস্থার মধ্যেই করা হয়েছে।
স্পেশাল অফিসারকে এখন নির্ধারণ করতে হবে, চাওয়া অর্থ আদালতের নির্দেশের আওতাভুক্ত কি না। খরচ নিয়মিত দলীয় পরিচালনা বা প্রয়োজনীয় আইনি বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে আদালত নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে অর্থ ছাড় করা যেতে পারে। অন্য কোনও খাতে খরচের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ রয়েছে এবং প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার দলীয় তহবিল নিয়ে বিরোধ রয়েছে। মমতা গোষ্ঠী আদালতের নজরদারিতে সীমিত অর্থ ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। জুন ও জুলাই মাসের খরচ মেটাতে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা চাওয়ার আবেদন এই আর্থিক বিরোধের পরবর্তী পর্যায় হিসেবে সামনে এসেছে।
মমতা গোষ্ঠীর স্পেশাল অফিসারকে পাঠানো চিঠিতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিষেধাজ্ঞার কারণে দলের নিয়মিত পরিচালনায় প্রভাব পড়ার কথা উঠে এসেছে। ৯০ লক্ষ টাকা চাওয়ার বিষয়ে স্পেশাল অফিসার কী সিদ্ধান্ত নেন এবং কত টাকা ছাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়, সেটিই এখন পরবর্তী বিষয়। দলের আর্থিক পরিচালনা আপাতত আদালত নির্ধারিত নজরদারি ব্যবস্থার অধীনেই থাকবে।











