Marathon Fusion-এর দাবি পারদ থেকে সোনা তৈরির উৎপাদন হার CERN-এর ১০ গুণ

আমেরিকার Marathon Fusion পরমাণু প্রযুক্তির সাহায্যে পারদ থেকে স্থিতিশীল সোনা তৈরির দাবি করেছে। সংস্থার দাবি, উৎপাদনের হার CERN-এর ২০২৫ সালের রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। তবে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই, উৎপাদন খরচ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সম্ভাবনা এখনও নিশ্চিত নয়।

আমেরিকার প্রযুক্তি সংস্থা Marathon Fusion পরমাণু প্রযুক্তির সাহায্যে পারদ থেকে স্থিতিশীল সোনা তৈরির দাবি করেছে। সংস্থার দাবি, তাদের পরীক্ষায় সোনা উৎপাদনের হার ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা সংস্থা CERN-এর ২০২৫ সালে প্রকাশিত রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি ছিল। তবে এই দাবির স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই এখনও হয়নি। পরীক্ষায় মোট কতটা সোনা তৈরি হয়েছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কত খরচ হয়েছে, সে সম্পর্কেও সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেনি সংস্থাটি।

পারদ থেকে সোনা তৈরির প্রচেষ্টা বহু শতাব্দী ধরে চলে আসছে। এবার আধুনিক পরমাণু প্রযুক্তির সাহায্যে সেই প্রক্রিয়ায় সাফল্য পাওয়ার দাবি করেছে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক Marathon Fusion। সংস্থাটি ২১ অক্টোবর ২০২৬ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে পরিচালিত একটি পরীক্ষায় পারদ থেকে স্থিতিশীল সোনা তৈরি করা হয়েছে।

সংস্থাটি সামাজিক মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তিতে সোনা উৎপাদনের হার CERN-এর ২০২৫ সালে প্রকাশিত রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। পরীক্ষার কয়েকটি বৈজ্ঞানিক পরিমাপও প্রকাশ করা হয়েছে। সেগুলিতে পারদের একটি নির্দিষ্ট আইসোটোপ থেকে সোনা তৈরির ইঙ্গিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে পরীক্ষায় মোট কত পরিমাণ সোনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি, উৎপাদনের হার নির্ধারণে কোন নির্দিষ্ট পরিমাপক ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত জানায়নি সংস্থাটি। ফলে এই দাবির স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া পরীক্ষাটিকে বাণিজ্যিকভাবে সোনা উৎপাদনের ক্ষেত্রে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

Marathon Fusion যে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, সেটি নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠন পরিবর্তন করে একটি মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তরিত করা হয়।

সংস্থার প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে প্রথমে নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে উচ্চগতির নিউট্রন তৈরি করা হয়। সেই নিউট্রন পারদের Mercury-198 আইসোটোপের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তেজস্ক্রিয় Mercury-197 তৈরি করতে পারে। পরবর্তী সময়ে Mercury-197 রূপান্তরিত হয়ে Gold-197-এ পরিণত হয়। Gold-197 হলো সোনার একটি স্থিতিশীল আইসোটোপ।

এই প্রক্রিয়ায় পারদ সরাসরি নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে সোনায় পরিণত হয় না। ফিউশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, সোনা তৈরির মূল প্রক্রিয়াটি হলো পরমাণুর রূপান্তর বা নিউক্লিয়ার ট্রান্সমিউটেশন।

Marathon Fusion-এর বিজ্ঞানীরা ২০২৫ সালের জুলাই মাসে arXiv-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে কম্পিউটার সিমুলেশনের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে উপযুক্ত একটি ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রতি গিগাওয়াট তাপীয় শক্তির জন্য বছরে প্রায় দুই টন সোনা উৎপাদন করতে পারে।

তবে এই পরিমাণ উৎপাদনের হিসাব কম্পিউটার সিমুলেশননির্ভর। সংস্থাটি এখনও কোনও চালু বাণিজ্যিক প্ল্যান্টে এই পরিমাণ সোনা উৎপাদন করে দেখায়নি।

সংস্থাটি যে ছোট রিঅ্যাক্টর নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছে, তার প্রস্তাবিত ফিউশন ক্ষমতা এক কিলোওয়াট। এই ক্ষমতা এক গিগাওয়াটের তুলনায় ১০ লক্ষ গুণ কম। ফলে সিমুলেশনে পাওয়া সম্ভাব্য উৎপাদনের হিসাবের সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফলাফলকে সরাসরি শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদনের সমতুল্য ধরা যায় না।

CERN ২০২৫ সালে জানিয়েছিল, Large Hadron Collider-এ ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন সোনার পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি হয়েছিল। সংখ্যাটি বড় হলেও, সেগুলির মোট ভর ছিল মাত্র ২৯ পিকোগ্রাম। এই পরিমাণ সোনা সাধারণ চোখে দেখা সম্ভব নয়।

CERN-এর পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল পরমাণুর কণাগুলির আচরণ নিয়ে গবেষণা করা, বাণিজ্যিকভাবে সোনা উৎপাদন করা নয়। তাই ওই পরীক্ষার ফলাফলকে সরাসরি শিল্পক্ষেত্রে সোনা উৎপাদনের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

Marathon Fusion-এর দাবি পারদ থেকে সোনা তৈরির উৎপাদন হার CERN-এর ১০ গুণ

Marathon Fusion তাদের উৎপাদনের হার CERN-এর কোন নির্দিষ্ট পরিমাপের সঙ্গে তুলনা করেছে, তা স্পষ্ট করেনি। ফলে সংস্থার দাবি অনুযায়ী উৎপাদনের হার ১০ গুণ বেশি হলেও, তুলনাটির ভিত্তি যাচাই করার জন্য আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো উপযুক্ত আইসোটোপের প্রাপ্যতা। প্রাকৃতিক পারদের মধ্যে Mercury-198-এর অনুপাত প্রায় ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, Marathon Fusion-এর গণনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ Mercury-198 ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতার পারদ সংগ্রহ করা উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এ ছাড়া পারদ বিষাক্ত হওয়ায় বড় পরিমাণে এটি ব্যবহার করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ায় অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ তৈরি হতে পারে।

সংস্থার কম্পিউটার সিমুলেশন অনুযায়ী, উৎপাদনের পর তৈরি হওয়া মিশ্রণকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তার মানে পৌঁছতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়ে মিশ্রণটির পরিশোধন এবং নিরাপদ সংরক্ষণের জন্য অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।

Marathon Fusion-এর অনুমান, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ফিউশন প্ল্যান্টগুলি সোনা বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির সাহায্যে বাজারে বিক্রির উপযোগী পরিমাণ ও বিশুদ্ধতার সোনা উৎপাদন করা সম্ভব কি না, তা এখনও প্রমাণিত হয়নি।

প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করতে পরীক্ষার সম্পূর্ণ বিবরণ, উৎপাদনের খরচ এবং তৈরি হওয়া সোনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত হওয়াও জরুরি। এই তথ্য ও যাচাই ছাড়া প্রযুক্তিটি পরীক্ষাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে সোনা উৎপাদনের একটি নতুন পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

 

Leave a comment