শরতের শুরুতেই গ্রাম বাংলার জলাশয়গুলিতে দেখা যায় সাদা, লাল কিংবা গোলাপি শাপলার সারি। দূর থেকে দেখতে সুন্দর এই জলজ উদ্ভিদটির বেশ কিছু অংশ রান্না করে খাওয়ার চল রয়েছে বাংলার গ্রামাঞ্চলে। বিশেষ করে শাপলার ডাঁটা দিয়ে তৈরি নানা পদ বেশ জনপ্রিয়। পুষ্টিগুণের কারণেও এই দেশজ খাবারটি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে অনেকের।
শাপলার কোন কোন অংশ খাওয়া যায়?
শাপলার ফুল সাধারণত সৌন্দর্যের জন্যই বেশি পরিচিত হলেও এর ডাঁটা ও ফলও খাওয়া যায়। শাপলার ফলের খোসা ছাড়ালে ভিতরে শাঁসের সঙ্গে পাওয়া যায় অসংখ্য বীজ। সেগুলিও খাওয়ার উপযোগী বলে স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়।অন্যদিকে শাপলার ডাঁটা দিয়ে তরকারি, বড়া-সহ বিভিন্ন পদ তৈরি করা যায়। তবে জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা শাপলা ব্যবহারের আগে ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং যথাযথভাবে রান্না করা জরুরি।
শাপলার ডাঁটা রান্না করবেন কীভাবে?
প্রথমে শাপলার ফুলের অংশটি বাদ দিয়ে ডাঁটা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ডাঁটার বাইরের আঁশ ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে পারেন।এরপর সাধারণ সবজির মতোই রান্না করা যায়। গ্রাম বাংলায় সর্ষে-পোস্ত দিয়ে শাপলার ডাঁটার ঝোল বা তরকারি বেশ জনপ্রিয়।
সর্ষে-পোস্তে শাপলা, স্বাদেও দুর্দান্ত
একটি সহজ রান্নার জন্য সর্ষে, পোস্ত, নুন ও কাঁচালঙ্কা সামান্য জল দিয়ে বেটে নিতে পারেন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ও কাঁচালঙ্কার ফোড়ন দিয়ে তার মধ্যে কাটা শাপলার ডাঁটা দিতে হবে।এরপর বাটা সর্ষে-পোস্ত দিয়ে প্রয়োজনমতো জল ও নুন মিশিয়ে ঢেকে রান্না করলেই তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু শাপলার তরকারি।
ডায়াবেটিসে শাপলা কি উপকারী?
শাপলায় বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ ও পুষ্টি উপাদান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে শাপলা খেলে ইনসুলিনের মাত্রা স্থিতিশীল থাকবে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিশ্চিতভাবে সাহায্য করবে—এমন দাবি করার আগে আরও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।তাই ডায়াবেটিস থাকলে শাপলাকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসই মূল বিষয়।
প্রস্রাবের জ্বালাপোড়ায় কি শাপলা খাওয়া যায়?
লোকজ খাদ্য ও ভেষজ ব্যবহারে শাপলার বিভিন্ন অংশের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, পেটের অস্বস্তি বা শরীর ঠান্ডা রাখার মতো কিছু উপকারের কথাও প্রচলিত রয়েছে।তবে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া অনেক সময় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা অন্য শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। শুধুমাত্র শাপলা খেয়ে এই ধরনের সমস্যা সারানোর চেষ্টা না করে উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
জলাশয় থেকে শাপলা তুললে সতর্ক থাকুন
শাপলা দেখতে প্রাকৃতিক ও নিরাপদ খাবার মনে হলেও যেকোনও জলাশয় থেকে তুলে সরাসরি খাওয়া ঠিক নয়। দূষিত জলাশয়ে জন্মানো উদ্ভিদের গায়ে ময়লা, জীবাণু বা দূষকের উপস্থিতি থাকতে পারে। তাই পরিষ্কার ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে এবং রান্না করে খাওয়াই ভালো।
গ্রাম বাংলার পুকুর, খাল ও বিলে বর্ষা-শরতের সময়ে ফুটে ওঠে শাপলা। শুধু সৌন্দর্য নয়, শাপলার ডাঁটা, ফল ও বীজও খাবার হিসেবে ব্যবহার করেন বহু মানুষ। লোকজ খাদ্যসংস্কৃতিতে এর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। তবে ডায়াবেটিস বা প্রস্রাবের সমস্যায় এটি উপকারী—এমন দাবিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে না দেখে খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।













