সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি শরীর সবসময় দুর্বল লাগে, হঠাৎ ওজন বাড়তে থাকে বা কমে যায়, চুল পড়ার সমস্যা বেড়ে যায় কিংবা গরম ও ঠান্ডার প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা তৈরি হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। এসব উপসর্গের অন্যতম কারণ হতে পারে থাইরয়েডের সমস্যা।গলার সামনের দিকে থাকা ছোট্ট প্রজাপতির মতো দেখতে থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন বিপাকক্রিয়া, শক্তি ব্যবস্থাপনা, হৃদস্পন্দন এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাই থাইরয়েড হরমোনের মাত্রায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে শরীরে একাধিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
অকারণে ওজন বাড়ছে? নজর দিন
থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে গেলে অর্থাৎ হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে কারও কারও ওজন বাড়তে পারে, পাশাপাশি ক্লান্তি, অলসতা ও ঠান্ডা লাগার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।আবার থাইরয়েড হরমোন অতিরিক্ত তৈরি হলে ওজন কমে যাওয়া, অস্থিরতা, অতিরিক্ত ঘাম বা গরম লাগা এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু ওজনের পরিবর্তন দেখেই থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিত করা যায় না। অন্য অনেক কারণেও এমন হতে পারে।
যে লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না
নিচের উপসর্গগুলি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো—
পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
অস্বাভাবিকভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
চুল পড়ার সমস্যা বেড়ে যাওয়া
অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম লাগা
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
কোষ্ঠকাঠিন্য
ঘুমের সমস্যা
মনোযোগ দিতে অসুবিধা
হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
গলার সামনের অংশে ফোলা বা গুটি দেখা দেওয়া
সব উপসর্গ একসঙ্গে দেখা যাবে এমন নয়। ব্যক্তিভেদে লক্ষণের ধরন ও তীব্রতা আলাদা হতে পারে।
কী বলছেন চিকিৎসক?
চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।তবে দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, চুল পড়া কিংবা গলায় ফোলার মতো লক্ষণ থাকলে নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শঅনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই নিরাপদ। সাধারণত থাইরয়েডের কার্যকারিতা বোঝার জন্য TSH পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা দিতে পারেন।
নিজে নিজে থাইরয়েডের ওষুধ খাবেন না
অনলাইনে উপসর্গ দেখে নিজেই থাইরয়েডের ওষুধ শুরু করা বিপজ্জনক হতে পারে। একইভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করাও ঠিক নয়।থাইরয়েডের ওষুধের ডোজ রোগীর শারীরিক অবস্থা ও পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। তাই কারও পরামর্শে বা অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
থাইরয়েড সুস্থ রাখতে কী করবেন?
থাইরয়েডের সমস্যা প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য কোনও ‘ম্যাজিক’ টোটকা নেই। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
সুষম খাবার খান
আয়োডিনযুক্ত লবণ পরিমিত ব্যবহার করুন
নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন
পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখুন
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করুন
পর্যাপ্ত জল পান করুন
নিয়মিত শাকসবজি ও ফল খান
তবে কারও থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে শুধুমাত্র জীবনযাত্রার পরিবর্তনের উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
ঘরোয়া টোটকায় কি থাইরয়েড সারে?
থাইরয়েডের সমস্যা সারানোর কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত ঘরোয়া টোটকা নেই। স্বাস্থ্যকর খাবার ও জীবনযাপন শরীর ভালো রাখতে সহায়ক হলেও তা চিকিৎসার বিকল্প নয়।ভেষজ উপাদান, সাপ্লিমেন্ট বা কোনও বিশেষ খাবার থাইরয়েডের ওষুধের পরিবর্তে ব্যবহার করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ কিছু সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ থাইরয়েডের চিকিৎসার সঙ্গে পারস্পরিক প্রভাব ফেলতে পারে।
অকারণে ওজন বেড়ে যাওয়া, সারাদিন ক্লান্তি, চুল পড়া কিংবা গরম-ঠান্ডা সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু এর নেপথ্যে থাইরয়েডের কার্যকারিতায় সমস্যা থাকতে পারে। শরীরের ছোট্ট এই গ্রন্থি হরমোনের ভারসাম্য ও বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমন উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।













