বর্ষা মানেই জল জমা, নোংরা জল এবং খাবার দূষিত হওয়ার আশঙ্কা। আর এই সময়েই বাড়তে পারে বিভিন্ন জলবাহিত রোগের ঝুঁকি। তার মধ্যে অন্যতম টাইফয়েড। তবে মনে রাখতে হবে, টাইফয়েড কোনও ভাইরাসের কারণে হয় না। Salmonella Typhi নামের ব্যাকটেরিয়া শরীরে ঢুকলে এই সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিষ্কার জল ও খাবার থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। তাই বর্ষায় খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে একটু বাড়তি সতর্ক থাকা জরুরি।
টাইফয়েড কীভাবে ছড়ায়?
টাইফয়েড মূলত দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত ব্যক্তির মল থেকে ব্যাকটেরিয়া জল বা খাবারে পৌঁছতে পারে। সেই দূষিত খাবার বা জল খেলে অন্য ব্যক্তির শরীরেও জীবাণু প্রবেশ করতে পারে।তাই শুধু বাইরে খাওয়াদাওয়া নয়, বাড়িতে ব্যবহৃত পানীয় জল, রান্নার উপকরণ এবং খাবার তৈরির পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
বর্ষায় এই ৫ ধরনের খাবার ও পানীয় থেকে সতর্ক থাকুন
অপরিশোধিত জল ও রাস্তার পানীয়
টাইফয়েড প্রতিরোধে প্রথমেই নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা জরুরি। রাস্তার ধারের শরবত, বরফ দেওয়া পানীয় কিংবা উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নন এমন জল এড়িয়ে চলাই ভালো।বাড়িতেও পানীয় জল নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করুন। বাইরে গেলে সঠিকভাবে সিল করা বোতল বা নিরাপদ জল পান করুন। নিয়মিত ব্যবহার করা জলের বোতল পরিষ্কার রাখাও জরুরি।
রাস্তার ফুচকা, চাটনি ও কাঁচা স্যালাড
বর্ষায় রাস্তার খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। খোলা জায়গায় তৈরি বা পরিবেশিত ফুচকা, চাটনি, কাঁচা পেঁয়াজ, স্যালাড ইত্যাদিতে দূষিত জল বা অপরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে জীবাণু পৌঁছতে পারে।তাই এই সময়ে পরিষ্কার পরিবেশে তৈরি, সদ্য রান্না করা খাবারকে অগ্রাধিকার দিন।
কাঁচা বা অল্প রান্না করা মাছ-সামুদ্রিক খাবার
মাছ বা সামুদ্রিক খাবার ভালোভাবে রান্না না করলে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যবাহিত জীবাণুর ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই মাছ, মাংস বা সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে রান্না করা জরুরি।কাঁচা খাবারের সঙ্গে রান্না করা খাবারের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলুন এবং রান্নাঘরের ছুরি, কাটিং বোর্ড ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরিষ্কার রাখুন।
রাস্তার ধারে কাটা ফল
কাটা ফল দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় থাকলে ধুলো, ময়লা, পোকামাকড় কিংবা দূষিত জলের সংস্পর্শে আসতে পারে। ফলে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই রাস্তার ধারে আগে থেকে কেটে রাখা ফলের বদলে গোটা ফল কিনে বাড়িতে ভালোভাবে ধুয়ে কেটে খাওয়া নিরাপদ অভ্যাস।
পাস্তুরাইজড নয় এমন দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
পাস্তুরাইজেশন ক্ষতিকর জীবাণু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তাই দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার কেনার সময় প্যাকেটের তথ্য দেখে পাস্তুরাইজড পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে উৎস বা সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত নন এমন দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
কাঁচা শাক-সবজি খেলেও কি ঝুঁকি আছে?
লেটুস, পালং, ধনেপাতা বা অন্যান্য কাঁচা শাক-সবজি সরাসরি টাইফয়েডের কারণ নয়। তবে এগুলি যদি দূষিত জল দিয়ে ধোয়া হয় বা ঠিকমতো পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে খাদ্যের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে ঢোকার ঝুঁকি থাকতে পারে।তাই কাঁচা খাওয়ার আগে শাক-সবজি ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং সম্ভব হলে রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।
টাইফয়েড এড়াতে দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—
খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
নিরাপদ বা পরিশোধিত পানীয় জল ব্যবহার করুন।
ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
কাটা ফল দীর্ঘক্ষণ খোলা অবস্থায় রাখবেন না।
রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলুন।
রান্না করা খাবার ঢেকে রাখুন।
কাঁচা ও রান্না করা খাবারের জন্য আলাদা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।
জলের বোতল নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
মাছ, মাংস ও অন্যান্য খাবার যথেষ্ট তাপমাত্রায় ভালোভাবে রান্না করুন।
জ্বর হলেই কি টাইফয়েড ধরে নেবেন?
না। জ্বর হলেই টাইফয়েড হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। টাইফয়েডের উপসর্গ অন্যান্য সংক্রমণের সঙ্গেও মিলে যেতে পারে।তবে একটানা কয়েক দিন জ্বর থাকা, পেটের সমস্যা, দুর্বলতা বা অন্যান্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক পরীক্ষা করিয়ে রোগ নির্ণয় করতে পারেন।টাইফয়েডের বিরুদ্ধে টিকাও রয়েছে। কার ক্ষেত্রে টিকা প্রয়োজন, তা বয়স, ঝুঁকি ও স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা যায়।
বর্ষাকালে দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে টাইফয়েড সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই রোগের জন্য দায়ী Salmonella Typhi ব্যাকটেরিয়া। রাস্তার খাবার, অপরিশোধিত জল, কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা খাবার থেকে ঝুঁকি বাড়তে পারে। সংক্রমণ এড়াতে কী কী সতর্কতা নেবেন এবং কোন খাবারগুলি বর্ষায় এড়িয়ে চলা ভালো, জানুন।













