শীতের দুপুরে গরম ভাতের সঙ্গে একটু ঝালঝাল শুঁটকি মাছ থাকলে আর কী চাই! শুঁটকির বিশেষ গন্ধ ও ঝাঁঝালো স্বাদ অনেকেরই প্রিয়। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় এই শুকনো মাছ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের ঘরোয়া পদ। কখনও রসুন-পেঁয়াজ দিয়ে বাবলা শুঁটকির ঝুরা, কখনও মশলাদার ভোলা শুঁটকির কষা, আবার কখনও ছোট চিংড়ি শুঁটকির চচ্চড়ি। রইল এমনই চার ধরনের শুঁটকি রান্নার সহজ পদ্ধতি।
বাবলা শুঁটকির ঝুরা: রসুন আর কাঁচালঙ্কায় জমজমাট স্বাদ
বাবলা শুঁটকির ঝুরা গরম ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য দারুণ একটি পদ। রসুন, পেঁয়াজ ও কাঁচালঙ্কার ঝাঁঝ শুঁটকির স্বাদকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
উপকরণ:
বাবলা শুঁটকি
সর্ষের তেল
পেঁয়াজ কুচি
রসুনের কোয়া
শুকনো লঙ্কা ও কাঁচালঙ্কা
টমেটো কুচি
হলুদ ও লঙ্কার গুঁড়ো
স্বাদমতো নুন
রান্নার পদ্ধতি:
প্রথমে বাবলা শুঁটকি হালকা আঁচে সেঁকে ছোট ছোট টুকরো করে নিন। এরপর গরম জলে ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা, রসুন ও পেঁয়াজ কুচি দিয়ে লালচে করে ভাজুন।
এবার শুঁটকি দিয়ে হলুদ, লঙ্কার গুঁড়ো, নুন, কাঁচালঙ্কা ও টমেটো কুচি মিশিয়ে দিন। কম আঁচে ভালো করে কষাতে থাকুন। শুঁটকি শুকনো ঝুরঝুরে হয়ে এলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন সুস্বাদু বাবলা শুঁটকির ঝুরা।
ভোলা শুঁটকির কষা: মশলাদার পদে বাড়বে ভাতের স্বাদ
যাঁরা ঝাল ও মশলাদার খাবার পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ভোলা শুঁটকির কষা হতে পারে ভালো বিকল্প। পেঁয়াজ, আদা-রসুন ও টমেটোর মশলায় এই পদ তৈরি করা যায় সহজেই।
উপকরণ:
ভোলা শুঁটকি
সর্ষের তেল
কালোজিরে
পেঁয়াজ কুচি
আদা-রসুন বাটা
টমেটো কুচি
কাঁচালঙ্কা
জিরে গুঁড়ো ও কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো
হলুদ ও নুন
ধনেপাতা কুচি
রান্নার পদ্ধতি:
প্রথমে শুঁটকির শক্ত বা অপ্রয়োজনীয় অংশ সরিয়ে উষ্ণ জলে কয়েকবার ধুয়ে নিন। জল ঝরিয়ে সামান্য নুন ও হলুদ মাখিয়ে রাখুন।
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ফোড়ন দিন। এরপর পেঁয়াজ কুচি, আদা-রসুন বাটা, টমেটো ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে মশলা কষিয়ে নিন। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে শুঁটকি দিয়ে জিরে গুঁড়ো ও কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো মেশান।
প্রয়োজনমতো অল্প জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। ঝোল ঘন হয়ে এলে এবং শুঁটকি ভালোভাবে সেদ্ধ হলে ওপর থেকে ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। তৈরি ঝালঝাল ভোলা শুঁটকির কষা।
ছোট চিংড়ি শুঁটকির চচ্চড়ি: সবজি দিয়ে আরও সুস্বাদু
ছোট চিংড়ি শুঁটকি দিয়ে তৈরি চচ্চড়ি ভাতের সঙ্গে বেশ মানানসই। চাইলে এর সঙ্গে বেগুন, আলু কিংবা পছন্দের অন্য সবজিও ব্যবহার করতে পারেন।
উপকরণ:
ছোট চিংড়ি শুঁটকি
সর্ষের তেল
পেঁয়াজ কুচি
রসুন বাটা
কাঁচালঙ্কা
সামান্য হলুদ ও নুন
বেগুন বা আলু কুচি
রান্নার পদ্ধতি:
প্রথমে চিংড়ি শুঁটকি ভালো করে বেছে শুকনো কড়াইয়ে হালকা নেড়ে নিন। এরপর উষ্ণ জলে প্রায় পাঁচ মিনিট ভিজিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে নিন।
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি, রসুন বাটা ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে হালকা ভাজুন। এবার শুঁটকি দিয়ে সামান্য হলুদ ও নুন মেশান। পছন্দমতো বেগুন বা আলু কুচি দিয়ে কম আঁচে ঢেকে রান্না করুন।
মাঝে মাঝে নেড়ে দিন, যাতে সবজি ও শুঁটকি সমানভাবে রান্না হয়। সবজি সেদ্ধ হয়ে গেলে এবং শুঁটকি থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন চিংড়ি শুঁটকির চচ্চড়ি।
মৌরলা বা কাচকি শুঁটকি ভাজা: অল্প সময়ে তৈরি মুচমুচে পদ
ছোট আকারের মৌরলা ও কাচকি শুঁটকি দিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় মুচমুচে ভাজা। অল্প উপকরণে রান্না করা যায় বলে ব্যস্ত দুপুরেও এই পদ বানানো সুবিধাজনক।
উপকরণ:
মৌরলা বা কাচকি শুঁটকি
সর্ষের তেল
শুকনো লঙ্কা
থেঁতো করা রসুন
পেঁয়াজ কুচি
কাঁচালঙ্কা বাটা
সামান্য হলুদ ও নুন
রান্নার পদ্ধতি:
শুঁটকি ভালো করে বেছে উষ্ণ জলে হালকা ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। এরপর কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা ও থেঁতো করা রসুন দিয়ে ফোড়ন দিন।
এবার পেঁয়াজ কুচি ও শুঁটকি দিয়ে নেড়ে ভাজুন। হলুদ, নুন ও কাঁচালঙ্কা বাটা মিশিয়ে কম আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করুন। শুঁটকি লালচে ও মুচমুচে হয়ে এলে নামিয়ে নিন। চাইলে সবজি মিশিয়েও চচ্চড়ি তৈরি করতে পারেন।
শুঁটকি রান্নার আগে যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখবেন
শুঁটকি মাছের স্বাদ ঠিক রাখতে এবং নিরাপদে রান্না করতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
রান্নার আগে শুঁটকি ভালো করে বেছে পরিষ্কার করুন।
প্রয়োজনে উষ্ণ জলে ভিজিয়ে অতিরিক্ত নুন ও ময়লা দূর করে নিন।
শুঁটকিতে আগে থেকেই নুন থাকতে পারে, তাই রান্নার সময় অল্প নুন দিয়ে স্বাদ দেখে নিন।
মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী রান্নার সময় বদলাতে পারে। ভালোভাবে রান্না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
শুঁটকি কেনার সময় পরিষ্কারভাবে শুকনো, সঠিকভাবে সংরক্ষিত এবং অস্বাভাবিক পচা গন্ধমুক্ত মাছ বেছে নিন।
শীতের মিঠে রোদে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে শুঁটকি মাছের ঝালঝাল পদ হলে জমে যায় দুপুরের খাওয়াদাওয়া। উত্তরবঙ্গের বহু বাড়িতে শুঁটকি মাছের ভর্তা, ঝুরা, চচ্চড়ি কিংবা মুচমুচে ভাজা বেশ জনপ্রিয়। বাবলা, ভোলা, ছোট চিংড়ি, মৌরলা ও কাচকি শুঁটকি দিয়ে তৈরি করা যায় নানা স্বাদের পদ। সামান্য সর্ষের তেল, রসুন, পেঁয়াজ ও কাঁচালঙ্কার মিশেলে সহজেই বাড়িতে বানিয়ে নিতে পারেন এই মুখরোচক রান্নাগুলি।













