বন্দে ভারতে চেপে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যান যাত্রীরা। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত পরিষেবা এবং দ্রুতগতির কারণে এই ট্রেন ইতিমধ্যেই ভারতীয় রেলের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু ট্রেনের ভিতরের প্রযুক্তি নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, চালকের কেবিনে কারা দায়িত্বে থাকেন তা নিয়ে ততটা জানা নেই অনেকের। আসলে একটি বন্দে ভারত ট্রেন চালানোর সময় কেবিনে দু’জন ক্রু সদস্য থাকেন—একজন লোকো পাইলট এবং একজন সহকারী লোকো পাইলট। তবে তাঁদের এখানে দায়িত্ব পাওয়ার পথটা বেশ কঠিন।
বন্দে ভারত চালান কতজন?
একটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের কেবিনে সাধারণত থাকেন একজন লোকো পাইলট ও একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকো পাইলট (ALP)। অর্থাৎ মোট দু’জন কর্মী ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন।তবে এই দায়িত্ব যে কোনও রেলকর্মী পেলেই পালন করতে পারেন না। বন্দে ভারতের মতো আধুনিক ট্রেন চালানোর জন্য অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং নিরাপত্তা রেকর্ডকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলাদা করে বন্দে ভারতের পাইলট নিয়োগ হয়?
বন্দে ভারত চালানোর জন্য রেলওয়ে আলাদা কোনও নতুন ক্যাডার তৈরি করে পাইলট নিয়োগ করে না। প্রথমে রেলওয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে Assistant Loco Pilot বা ALP হিসেবে চাকরিতে যোগ দিতে হয়।এই পদের জন্য সাধারণত দশম শ্রেণি পাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কারিগরি শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হয়। আইটিআই, ডিপ্লোমা কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো যোগ্যতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল শাখার ক্ষেত্রে।তবে ALP হিসেবে চাকরি পেলেই সরাসরি বন্দে ভারতের কেবিনে বসার সুযোগ মেলে না।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা না থাকলে সুযোগ মেলে না!
বন্দে ভারত চালানোর দায়িত্ব সাধারণত অভিজ্ঞ সিনিয়র লোকো পাইলটদের মধ্য থেকেই দেওয়া হয়। পণ্যবাহী ট্রেন, যাত্রীবাহী ট্রেন, মেল/এক্সপ্রেস এবং সুপারফাস্ট ট্রেন চালানোর অভিজ্ঞতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সিনিয়র কর্মীদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হয়। শুধু চাকরির বয়সই নয়, তাঁদের অতীতের নিরাপত্তা রেকর্ডও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।দুর্ঘটনামুক্ত পরিষেবা এবং ভালো সেফটি রেকর্ড থাকা কর্মীরা এই দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকেন।
বন্দে ভারত চালাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন?
সাধারণ ট্রেনের সঙ্গে বন্দে ভারতের প্রযুক্তিগত কাঠামোর বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রচলিত অনেক ট্রেন যেখানে আলাদা লোকোমোটিভের মাধ্যমে টানা হয়, বন্দে ভারত ট্রেনসেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে।এই ব্যবস্থায় ট্রেনের কোচগুলির মধ্যেই পাওয়ার ও মোটর সংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এর অপারেশন এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে চালকের বিশেষ জ্ঞান থাকা দরকার।এই কারণেই নির্বাচিত লোকো পাইলট ও সহকারী লোকো পাইলটদের বন্দে ভারত পরিচালনার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সিমুলেটর প্রশিক্ষণও রয়েছে।
কোথায় দেওয়া হয় প্রশিক্ষণ?
বন্দে ভারত পরিচালনার জন্য নির্বাচিত কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। গাজিয়াবাদ ও চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (ICF)-সহ জোনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।সিমুলেটরের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ট্রেন পরিচালনার অনুশীলন করানো হয়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের আগে চালকেরা আধুনিক ট্রেনসেটের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পান।
শুধু বসে ট্রেন চালানো নয়, দায়িত্বও অনেক
বন্দে ভারত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে। তাই এত দ্রুতগতির ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রে চালকের মনোযোগ, অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তা সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।একদিকে আধুনিক প্রযুক্তি সামলানো, অন্যদিকে রেলপথের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে বন্দে ভারতের কেবিনে দায়িত্ব পালন করা যথেষ্ট দক্ষতার বিষয়।
তেলুগু রাজ্যেও বেড়েছে বন্দে ভারতের পরিষেবা
বন্দে ভারত পরিষেবা ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা মিলিয়ে একাধিক বন্দে ভারত পরিষেবা চলছে।সেকেন্দ্রাবাদ-বিশাখাপত্তনম, সেকেন্দ্রাবাদ-তিরুপতি, কাচেগুড়া-যশবন্তপুর, নাগপুর-সেকেন্দ্রাবাদ, দুর্গ-বিশাখাপত্তনম এবং বিশাখাপত্তনম-ভুবনেশ্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে এই পরিষেবা রয়েছে।
সিটিং থেকে স্লিপার—বন্দে ভারতেও বদলাচ্ছে পরিষেবা
শুধু দিনের যাত্রার জন্য নয়, দূরপাল্লার রাতের সফরের কথা মাথায় রেখেও বন্দে ভারত পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সিটিং সংস্করণের পাশাপাশি স্লিপার বন্দে ভারতেও যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির বার্থের ব্যবস্থা রয়েছে।স্লিপার সংস্করণে ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ড এসি শ্রেণির মতো সুবিধা এবং ব্যক্তিগত পরিসর বজায় রাখার জন্য পর্দার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তেলুগু রাজ্যগুলিতে সেকেন্দ্রাবাদ-নয়াদিল্লি এবং বিজয়ওয়াড়া-বেঙ্গালুরু রুটে স্লিপার বন্দে ভারত চালুর প্রস্তুতির কথাও উঠে এসেছে।
বন্দে ভারত এক্সপ্রেস দেশের অন্যতম আধুনিক সেমি-হাই-স্পিড ট্রেন। কিন্তু জানেন কি, এই ট্রেনের কেবিনে একসঙ্গে কতজন লোকো পাইলট দায়িত্ব সামলান? বন্দে ভারত চালানোর জন্য আলাদা করে নতুন পাইলট নিয়োগ করা হয় না। বরং অভিজ্ঞ রেলকর্মীদের মধ্য থেকেই বেছে নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।













