নবাবি আমলের ইতিহাসের সঙ্গে জমিদারি ঐতিহ্যের মেলবন্ধন—মুর্শিদাবাদের নশিপুর রাজবাড়ি আজও সেই পুরনো দিনের গল্প বলে। আর ঝুলনযাত্রাকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ চত্বর হয়ে উঠেছে আরও প্রাণবন্ত। পুজো, মেলা, যাত্রাপালা আর পুরনো রাজবাড়ির স্থাপত্য—সব মিলিয়ে উইকেন্ডে ঘুরে দেখার জন্য জায়গাটি হতে পারে বেশ আকর্ষণীয়।
নশিপুর রাজবাড়িতে আজও টিকে ঐতিহ্য
মুর্শিদাবাদ শহরের কাছেই অবস্থিত নশিপুর। এই এলাকাতেই রয়েছে ঐতিহাসিক নশিপুর রাজবাড়ি। রাজা দেবী সিংহের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই রাজপরিবারের ইতিহাস। তাঁর সময় থেকেই এই রাজবাড়িকে ঘিরে জমিদারি ঐতিহ্যের বিস্তার ঘটে।আজও সেই পুরনো পরম্পরা ধরে ঝুলনযাত্রার আয়োজন করা হয়। উৎসব উপলক্ষে শুধু স্থানীয় মানুষই নন, দূরদূরান্ত থেকেও বহু দর্শনার্থী এখানে আসেন।
রাজা দেবী সিংহের সঙ্গে জড়িয়ে ইতিহাস
ইতিহাসের পাতা অনুযায়ী, ১৭৫৬ সালে পানিপথ থেকে বাংলায় আসেন দেবী সিংহ। ব্যবসার সূত্রে বাংলায় এসে পরবর্তীতে ব্রিটিশদের অধীনে রাজস্ব আদায়ের কাজে যুক্ত হন। কাজের দক্ষতার কারণে ধীরে ধীরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। পরবর্তীকালে নশিপুরে রাজপরিবার ও রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়।এই ইতিহাসের কারণেই নশিপুর রাজবাড়ি শুধু একটি পুরনো প্রাসাদ নয়, বাংলার জমিদারি আমলের স্মৃতিবাহী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
রাজবাড়ি ঘিরে বড় মেলা
ঝুলনযাত্রাকে কেন্দ্র করে নশিপুর রাজবাড়ি চত্বরে বসে বড় মেলা। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থীর ভিড় দেখা যায়। মেলার সঙ্গে রয়েছে যাত্রাপালার আয়োজনও।ভক্তি, লোকসংস্কৃতি এবং পুরনো রাজবাড়ির আবহ—সব মিলিয়ে উৎসবের পরিবেশে তৈরি হয় অন্যরকম আকর্ষণ।
রয়েছে নশিপুর আখড়াও
নশিপুর রাজবাড়ির কাছেই ভাগীরথী নদীর পূর্ব দিকে রয়েছে নশিপুর আখড়া। এটি রামানুজ সম্প্রদায়ের সাধুদের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাচীন আখড়া হিসেবে পরিচিত।রাজবাড়ি এবং আখড়া—দুই জায়গাই নশিপুরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশাল অন্দরমহলের অনেকটাই আজ অতীত
একসময় নশিপুর রাজবাড়ির বিস্তৃতি ছিল অনেকটা বড়। রাজবাড়ি, মন্দির ও নাটমন্দির মিলিয়ে প্রায় ২০ বিঘা এলাকা জুড়ে ছিল এই সম্পত্তি। অন্দরমহলে ছিল প্রায় ৭০টি ঘরতবে জমিদারি প্রথা বিলোপের পর আর্থিক সমস্যার কারণে বিশাল অন্দরমহলের যথাযথ সংস্কার সম্ভব হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে তার বড় অংশই হারিয়ে যায়। বর্তমানে অবশিষ্ট রাজপ্রাসাদ ও মন্দিরের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
ঝুলনযাত্রার বিশেষ আকর্ষণ কী?
ঝুলনযাত্রা বাংলার প্রাচীন বৈষ্ণব ঐতিহ্যের অন্যতম উৎসব। এই উৎসবে সাজানো দোলনায় রাধা ও শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহকে বসিয়ে দোল দেওয়া হয়।শ্রাবণী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসব পালিত হলেও নশিপুর রাজবাড়ির ঝুলনের বিশেষ আকর্ষণ হল তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন রাজপরিবারের ঐতিহ্য।
উইকেন্ডে কেন যাবেন নশিপুর?
যাঁরা সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে ইতিহাস, পুরনো স্থাপত্য ও বাংলার লোকঐতিহ্য কাছ থেকে দেখতে চান, তাঁদের জন্য নশিপুর ভালো বিকল্প হতে পারে। রাজবাড়ির পরিবেশের পাশাপাশি ঝুলন উৎসবের সময় মেলার আমেজও বাড়তি আকর্ষণ।তাই এই উইকেন্ডে মুর্শিদাবাদ যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নশিপুর রাজবাড়িকে ভ্রমণ তালিকায় রাখতে পারেন।
উইকেন্ডে শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে চাইলে মুর্শিদাবাদের নশিপুর হতে পারে দারুণ গন্তব্য। প্রাচীন নশিপুর রাজবাড়িতে ঐতিহ্য মেনে আয়োজিত হয়েছে ঝুলনযাত্রা। রাজপ্রাসাদ, মন্দির, নাটমন্দির এবং জমজমাট মেলার আবহে উৎসবে ভিড় জমাচ্ছেন বহু মানুষ।













