ছুটিতে পাহাড়ে যেতে চান, আবার শহরের কোলাহল থেকে দূরে বাংলার লোকশিল্প ও গ্রামীণ জীবনকেও কাছ থেকে দেখতে চান? তাহলে আপনার পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে বাঁকুড়ার ভরতপুর। শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রাম যেন প্রকৃতি আর শিল্পের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এখানকার বাড়ির দেওয়ালে চোখে পড়ে পটচিত্রের নানা রঙিন কাহিনি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, শিল্পীরা নিজেরাই পাহাড়ের পাথর গুঁড়িয়ে তৈরি করেন ছবির রং। কাছাকাছি রয়েছে রিসর্টে থাকার ব্যবস্থাও।
![]()
কোথায় রয়েছে ছবির মতো সুন্দর ভরতপুর গ্রাম?
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ছাতনা ব্লকে শুশুনিয়া পাহাড়ের কাছেই অবস্থিত ভরতপুর গ্রাম। চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, পাহাড়ের উপস্থিতি এবং শিল্পীদের বসবাস—সব মিলিয়ে জায়গাটির আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। শুশুনিয়া বেড়াতে গেলে এই গ্রাম ঘুরে দেখলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় যোগ হতে পারে নতুন মাত্রা।
গ্রামের পরিচয় পটচিত্র শিল্পীদের হাত ধরে
ভরতপুরের বিশেষ পরিচিতি এখানকার পটুয়া শিল্পীদের জন্য। বাংলার প্রাচীন লোকশিল্প পটচিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই গ্রামের দীর্ঘ ঐতিহ্য। একসময় এই শিল্পীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাঁদের আঁকা ছবি দেখাতেন। ছবির সঙ্গে গান গেয়ে শোনাতেন কাহিনি। পৌরাণিক গল্প থেকে শুরু করে সামাজিক নানা বিষয়—সবই ফুটে উঠত পটের পরতে পরতে।
কীভাবে তৈরি হয় পটচিত্র?
পটচিত্র মূলত কাপড় বা কাগজের উপর ধারাবাহিকভাবে ছবি এঁকে গল্প বলার এক বিশেষ শিল্পরীতি। একটি ছবির পর আরেকটি ছবি সাজিয়ে শিল্পীরা তুলে ধরেন কোনও কাহিনি বা ঘটনার বিবরণ। শুধু ছবি আঁকাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গল্প বলার ঐতিহ্যও। এই শিল্প একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম ছিল।
পাহাড়ের পাথর গুঁড়িয়ে তৈরি হয় প্রাকৃতিক রং
ভরতপুরের পটচিত্রের অন্যতম আকর্ষণ শিল্পীদের নিজস্ব রং তৈরির কৌশল। শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বিভিন্ন রঙের পাথর সংগ্রহ করেন তাঁরা। সেই পাথর গুঁড়িয়ে তৈরি করা হয় রঙের উপাদান। পাশাপাশি নানা প্রাকৃতিক উপকরণ থেকেও রং প্রস্তুত করা হয়। রাসায়নিক রঙের মতো অতিরিক্ত উজ্জ্বল না হলেও এই প্রাকৃতিক রঙের নিজস্ব স্নিগ্ধতা রয়েছে। ছবির সূক্ষ্ম রেখা ও রঙের ব্যবহার পটচিত্রকে দেয় স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।
প্রতিকূলতা পেরিয়ে ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার লড়াই
একসময় আর্থিক অনটন, দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার কারণে ভরতপুরের পটচিত্র শিল্পের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছিল। জীবিকার তাগিদে অনেক শিল্পীকে পেশা বদলাতেও হয়েছে। তবু গ্রামের একাধিক শিল্পী এখনও এই লোকশিল্পের ধারা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁদের আঁকা ছবিতে ফুটে উঠছে বাংলার সংস্কৃতি, পুরনো কাহিনি এবং গ্রামীণ জীবনের নানা দিক।
কোথায় থাকবেন? রয়েছে রিসর্টের সুবিধাও
ভরতপুরের আশপাশে শুশুনিয়া পাহাড় এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কাছাকাছি রিসর্টে থাকার ব্যবস্থাও পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শুধু দিনের সফর নয়, চাইলে পরিকল্পনা করে কিছুটা সময় নিয়ে এলাকাটি ঘুরে দেখা যেতে পারে। তবে যাওয়ার আগে রিসর্টের ঘর, ভাড়া এবং বুকিংয়ের বিষয়টি সরাসরি যাচাই করে নেওয়া ভালো।
ভরতপুরে গেলে কী কী দেখবেন?
শুধু পাহাড় বা রিসর্টে সময় কাটিয়েই ফিরে আসবেন না। সুযোগ থাকলে গ্রামের পটুয়া শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলুন। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে পটচিত্র তৈরির পদ্ধতি দেখুন, প্রাকৃতিক রং প্রস্তুতির কৌশল জানুন এবং ছবির পিছনে থাকা গল্প শুনুন। শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি পটচিত্র কেনার সুযোগ থাকলে স্থানীয় শিল্পীদেরও উৎসাহ দেওয়া সম্ভব।
বাঁকুড়ার ছাতনা ব্লকে শুশুনিয়া পাহাড়ের কাছেই রয়েছে ছবির মতো সুন্দর গ্রাম ভরতপুর। এই গ্রামের পরিচিতি শুধু পাহাড়-জঙ্গলের জন্য নয়, এখানকার পটচিত্রশিল্পীদের জন্যও। শিল্পীরা শুশুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সংগ্রহ করা নানা রঙের পাথর গুঁড়িয়ে প্রাকৃতিক রং তৈরি করেন। সেই রং দিয়েই ফুটিয়ে তোলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র। প্রকৃতির সান্নিধ্য, লোকশিল্পের পরিচয় এবং কাছাকাছি রিসর্টে থাকার সুযোগ—সব মিলিয়ে ছুটির জন্য আকর্ষণীয় অফবিট ঠিকানা হতে পারে ভরতপুর।













