প্রদীপের আলো, রঙিন রঙ্গোলি, নতুন পোশাক, মিষ্টিমুখ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—দীপাবলি এলেই এমন ছবিই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই উৎসব পালনের রীতি আলাদা হলেও আলোর উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে রয়েছে দেশের সীমানা পেরিয়েও। নেপাল থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া থেকে শ্রীলঙ্কা, এমনকী প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতেও দীপাবলি ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। তবে প্রতিটি দেশের উদযাপনের ধরনে রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছাপ।
নেপাল: পাঁচ দিনের তিহার উৎসবে কুকুরের জন্য বিশেষ দিন
ভারতের প্রতিবেশী দেশ নেপালে দীপাবলি পালিত হয় ‘তিহার’ নামে। পাঁচ দিন ধরে চলা এই উৎসবে দেবদেবীর আরাধনার পাশাপাশি পশুপাখির প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ‘কুকুর তিহার’।এই বিশেষ দিনে কুকুরদের গলায় ফুলের মালা পরানো হয়, কপালে তিলক এঁকে দেওয়া হয় এবং তাদের পছন্দের খাবার খাওয়ানো হয়। মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে কুকুরের অবদানের প্রতি সম্মান জানাতেই এই রীতি পালন করা হয়। পাশাপাশি বাড়ি সাজানো, প্রদীপ জ্বালানো, রঙিন আলপনা তৈরি এবং আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েও নেপালে তিহার উদযাপিত হয়।
সিঙ্গাপুর: আলোর সাজে ঝলমল করে লিটল ইন্ডিয়া
সিঙ্গাপুরে দীপাবলি পরিচিত ‘ডিপাবলি’ বা ‘ডিপাভলি’ নামে। দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই উপলক্ষে সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত লিটল ইন্ডিয়া এলাকা সেজে ওঠে বর্ণিল আলোকসজ্জায়।রাস্তাজুড়ে আলো, ফুলের সাজ, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, মিষ্টির দোকান এবং কেনাকাটার ভিড়ে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও এই সময় লিটল ইন্ডিয়া হয়ে ওঠে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। এখানে আতশবাজির চেয়ে আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অনেক বেশি চোখে পড়ে।
মালয়েশিয়া: প্রদীপ, রঙ্গোলি আর পারিবারিক মিলনমেলা
মালয়েশিয়াতেও দীপাবলি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব। দেশটিতে এই উৎসব ‘হরি দীপাবলি’ নামেও পরিচিত। দীপাবলির দিন মালয়েশিয়ায় সরকারি ছুটি থাকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই উৎসব ঘিরে আগ্রহ দেখা যায়।বাড়ির সামনে প্রদীপ জ্বালানো, রঙিন রঙ্গোলি তৈরি, নতুন পোশাক পরা এবং আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করার মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করা হয়। বাড়িতে তৈরি হয় নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও মিষ্টি। আতশবাজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকায় প্রদীপ ও আলোকসজ্জাই উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
শ্রীলঙ্কা: তামিল ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে দীপাবলি
ভারতের দক্ষিণের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কাতেও দীপাবলি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। বিশেষ করে দেশের তামিল হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই উৎসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে।উৎসব উপলক্ষে বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানো, পুজো করা, নতুন পোশাক পরা এবং মিষ্টি বিতরণের রীতি প্রচলিত। পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের সঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন মানুষ। অনেক জায়গায় আলোকসজ্জা ও আতশবাজিও উৎসবের আনন্দ বাড়িয়ে তোলে। ভারতের সঙ্গে ধর্মীয় যোগসূত্র থাকলেও শ্রীলঙ্কার নিজস্ব তামিল সংস্কৃতি দীপাবলি উদযাপনে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
ফিজি: প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রেও আলোর উৎসব
প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতেও দীপাবলি বেশ জনপ্রিয় উৎসব। দেশটিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে দীপাবলি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।এই উপলক্ষে ফিজিতে সরকারি ছুটি থাকে। বাড়িঘর সাজানো, প্রদীপ জ্বালানো, মিষ্টি বিনিময় এবং আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করেন মানুষ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণও দীপাবলিকে আরও বর্ণময় করে তোলে।
দীপাবলি শুধু ভারতের উৎসব নয়, বিশ্বের একাধিক দেশেও নানা রীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পালিত হয় আলোর এই উৎসব। নেপালের পাঁচ দিনের তিহার উৎসবে রয়েছে কুকুর পুজোর বিশেষ রীতি। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ফিজিতেও প্রদীপ, আলোকসজ্জা, ধর্মীয় আচার এবং পারিবারিক মিলনমেলার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় দীপাবলি।













