দেশি ঘি ভারতীয় খাদ্য-সংস্কৃতির একটি অমূল্য উপাদান। আয়ুর্বেদে ঘি-র ব্যবহার যেমন বহুবছরের, তেমনই আধুনিক পুষ্টিবিদ্যার দৃষ্টিতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ঘি পুরনো হলে পুষ্টিগুণ বেড়ে যায়—এমন একটি বিশ্বাস বহুদিন ধরে চলেছে সমাজে। বিশেষ করে প্রোটিনের মাত্রা নাকি বাড়ে! তবে এই দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা দৃঢ়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।
ঘি—ভারতীয় রান্না ও পুষ্টির অভিন্ন অংশ
ভারতীয় বাড়িতে ঘি ছাড়া রান্নাঘর ভাবাই যায় না। ভাতের সঙ্গে সামান্য ঘি, মশলা-মুড়ি, পরোটা, ভাজা-ভুনায় কিংবা আয়ুর্বেদের নানা চিকিৎসায় ঘি একটি স্থায়ী উপস্থিতি। স্বাদ, গন্ধ, আর হজমশক্তি বৃদ্ধির জন্য ঘি বহু মানুষের প্রথম পছন্দ। আধুনিক যুগেও ফিটনেসপ্রেমীরা সাধারণ তেল বাদ দিয়ে ঘি-কে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে মানছেন।

পুরনো ঘি কি সত্যিই বেশি ‘শক্তিশালী’?
বাংলার বহু পরিবারেই শোনা যায়—যত পুরনো ঘি, তত বেশি উপকারী। আয়ুর্বেদে ‘পুরাতন ঘৃত’ নামে পরিচিত বহু বছর ধরে রাখা দেশি ঘি, বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। বলা হয় এটি প্রদাহ কমায়, শ্বাসকষ্টের সমস্যা হ্রাস করে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়।এই প্রচলিত ধারণা থেকেই জন্ম নিয়েছে আরেকটি বিশ্বাস—পুরনো ঘি নাকি বেশি পুষ্টিকর।
প্রোটিন বাড়ার দাবি—বাস্তবে কতটা সত্যি?
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে—অনেকে দাবি করছেন, পুরনো ঘিতে নাকি প্রাকৃতিকভাবে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে ঠিক উলটো কথা।ঘি তৈরির সময় দুধ থেকে মাখন আলাদা করা হয়, এরপর উত্তাপে সব ধরনের জলীয় অংশ, ল্যাকটোজ ও প্রোটিন প্রায় সম্পূর্ণই বেরিয়ে যায়। ফলে ঘি-তে থেকে যায় মূলত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, মিডিয়াম চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড, ফ্যাট সলিউবল ভিটামিন।

বিশেষজ্ঞের মত—“ঘি-তে প্রোটিন থাকার প্রশ্নই ওঠে না”
ডায়েটিশিয়ান ও পুষ্টিবিদ অন্তরা মজুমদার স্পষ্ট জানাচ্ছেন—“ঘি নিজে কোনও প্রোটিনের উৎসই নয়। ঘি যত পুরনোই হোক না কেন, প্রোটিন বাড়বে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ ঘি তৈরির প্রক্রিয়াতেই প্রোটিন অপসারিত হয়ে যায়।”তিনি আরও বলেন, ঘি-র বয়স বাড়লে স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত বৈশিষ্ট্যে কিছু পরিবর্তন হয় ঠিকই, তবে পুষ্টি উপাদানের কাঠামো আগের মতোই থাকে। তাই পুরনো ঘিতে প্রোটিন বাড়ার ধারণাটি বৈজ্ঞানিক নয়।

তাহলে পুরনো ঘি উপকারী কেন বলে মনে করা হয়?
আয়ুর্বেদ বলছে, পুরনো ঘি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন রেখে দেওয়া ঘি শরীরকে হালকা করে, হজমশক্তি বাড়ায় এবং অগ্নিমন্দ্য কমাতে সাহায্য করে। শ্বাসকষ্ট, কাশি বা স্লিপ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রেও পুরনো ঘি ব্যবহারের কথা বলা হয়।তবে এই উপকারিতা সবটাই প্রোটিন নয়, ফ্যাটের পরিবর্তিত রাসায়নিক গুণ, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য এবং আয়ুর্বেদের প্রস্তাবিত থেরাপিউটিক প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত।নতুন ঘি বনাম পুরনো ঘি—কার উপকার বেশি?
নতুন ঘি:
ভিটামিন A, D, E, K সমৃদ্ধ
রান্নার জন্য উপযুক্ত
শক্তি জোগায় দ্রুত
স্বাদে মোলায়েম
পুরনো ঘি:
স্বাদ একটু তীব্র
হজমে তুলনামূলক ভালো
প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে
আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত
বাস্তবিক অর্থে পুষ্টির দিক দিয়ে দুই ঘি-ই প্রায় সমান। একটির বয়স বাড়লে পুষ্টিমান বাড়ে না, কেবল গুণগত প্রয়োগের জায়গা পাল্টায়।
দেশি ঘি নিয়ে বহুদিন ধরেই প্রচলিত রয়েছে নানা ধারণা—বিশেষত পুরনো ঘি নাকি নতুনের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর। কিন্তু এই বিশ্বাস কতটা সত্যি? বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘি একটি বিশুদ্ধ ফ্যাট এবং সময়ের সঙ্গে এর প্রোটিন বাড়ে না। তবে পুরনো ঘি আয়ুর্বেদে কিছু বিশেষ ঔষধিগুণের জন্য পরিচিত।













