সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! ‘বেগম’-এর ইতিহাস জানলে অবাক হবেন, কোথায় হারিয়ে গেল এই বিরল প্রাণী?

সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় বিচরণ করত জাভা গন্ডারও। গবেষক ড. অনিমেষ মণ্ডলের তথ্য, বেগমের ইতিহাস ও এই বিরল প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার কারণ জানুন।

সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘের গর্জন, নদীর বুকে কুমির আর ম্যানগ্রোভের ঘন সবুজ—এই ছবির সঙ্গেই পরিচিত আমরা। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগের সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ছিল আরও বৈচিত্র্যময়। শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, এই জলাভূমি ও নদীবেষ্টিত অরণ্যে একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! বর্তমানে যাদের অস্তিত্ব সুন্দরবনে নেই, তাদের ঘিরে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক তথ্য। সম্প্রতি গবেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর অজানা ইতিহাস।

 সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! ‘বেগম’-এর ইতিহাস জানলে অবাক হবেন, কোথায় হারিয়ে গেল এই বিরল প্রাণী?
সুন্দরবনের জঙ্গলে একসময় ছিল জাভা গন্ডারের বাস

সুন্দরবনকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ অরণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এই অরণ্যের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু অতীতে এখানকার জীববৈচিত্র্যের তালিকায় ছিল আরও অনেক বিরল বন্যপ্রাণী।সুন্দরবন বিষয়ক গবেষক ড. অনিমেষ মণ্ডলের তথ্য অনুযায়ী, একসময় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল, নদীর চর এবং জলাভূমিতে গন্ডারের বিচরণ ছিল। তৎকালীন দুই ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকাতেও তাদের উপস্থিতির কথা জানা যায়।ঘাসে ঢাকা নদীর চর, কাদামাটির জমি এবং জলাভূমির আশপাশে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াত এই প্রাণীরা। সুন্দরবনের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই তাদের জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছিল।

দেখতে কেমন ছিল এই জাভা গন্ডার?

জাভা গন্ডার আকারে ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডারের তুলনায় কিছুটা ছোট। এদের শরীরের চামড়া তুলনামূলক মসৃণ এবং পুরুষ গন্ডারের নাকে থাকত একটি ছোট শিং।স্বভাবের দিক থেকে এরা ছিল বেশ লাজুক ও একাকী। সাধারণত ঘন জঙ্গলের আড়ালে থাকতে পছন্দ করত। পাতা, কচি ডালপালা এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ছিল এদের প্রধান খাদ্য।জলাভূমি ও ঘন অরণ্যের মধ্যে চলাফেরা করার উপযোগী শারীরিক বৈশিষ্ট্যও ছিল এদের। ফলে সুন্দরবনের মতো নদী-খাঁড়ি ও কাদামাটিতে ভরা পরিবেশেও একসময় এরা স্বাভাবিকভাবে বসবাস করত।

 সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! ‘বেগম’-এর ইতিহাস জানলে অবাক হবেন, কোথায় হারিয়ে গেল এই বিরল প্রাণী?
‘বেগম’-এর ইতিহাস আজও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ

সুন্দরবনের জাভা গন্ডারের ইতিহাসে ‘বেগম’ নামে একটি স্ত্রী গন্ডারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৮৭২ সালে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে এই গন্ডারটিকে সংগ্রহ করে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রায় ২৮ বছর বেঁচে ছিল সে।গবেষকদের কাছে ‘বেগম’-এর অস্তিত্ব এবং তার সংরক্ষিত বৈজ্ঞানিক নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তথ্য সুন্দরবন ও সংলগ্ন অঞ্চলে অতীতে গন্ডারের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করে।

কেন সুন্দরবন থেকে হারিয়ে গেল জাভা গন্ডার?

একসময় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে বসবাস করলেও ধীরে ধীরে এই প্রাণীদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

এর পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

- নির্বিচারে শিকার: গন্ডারের শিংয়ের চাহিদার কারণে শিকারিদের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল এই প্রাণী।

- বনভূমি ধ্বংস: মানুষের বসতি ও কৃষিজমির বিস্তারে তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান সংকুচিত হতে থাকে।

- নদীভাঙন: নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও ভাঙনের ফলে অনেক প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যায়।

- মানুষের হস্তক্ষেপ: অরণ্যের উপর মানুষের চাপ বাড়তে থাকায় বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।

এই সমস্ত কারণের সম্মিলিত প্রভাবে সুন্দরবন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় জাভা গন্ডার।

 সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! ‘বেগম’-এর ইতিহাস জানলে অবাক হবেন, কোথায় হারিয়ে গেল এই বিরল প্রাণী?
আজ কোথায় রয়েছে সেই বিরল গন্ডার?

আজ সুন্দরবনের জঙ্গলে জাভা গন্ডারের দেখা মেলে না। তাদের অতীত উপস্থিতির কথা জানা যায় মূলত ঐতিহাসিক বিবরণ, গবেষণা এবং পুরনো বৈজ্ঞানিক নথি থেকে।বর্তমানে জাভা গন্ডার বিশ্বের অত্যন্ত বিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের উজুং কুলন জাতীয় উদ্যান এই প্রজাতির শেষ বন্য আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গল্প নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

 সুন্দরবনে শুধু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার নয়, একসময় ঘুরে বেড়াত জাভা গন্ডারও! ‘বেগম’-এর ইতিহাস জানলে অবাক হবেন, কোথায় হারিয়ে গেল এই বিরল প্রাণী?
সুন্দরবন বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, ম্যানগ্রোভ অরণ্য আর নদী-খাঁড়ির ছবি। কিন্তু এই অরণ্যের অতীত ইতিহাসে লুকিয়ে রয়েছে আরও এক বিস্ময়কর অধ্যায়। গবেষণা ও ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, একসময় সুন্দরবন এবং সংলগ্ন দুই ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিচরণ করত জাভা গন্ডার। ‘বেগম’ নামে একটি স্ত্রী গন্ডারকে ১৮৭২ সালে সুন্দরবন অঞ্চল থেকে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু মানুষের শিকার, বনভূমি ধ্বংস এবং পরিবেশের পরিবর্তনে হারিয়ে যায় এই বিরল প্রাণী।

Leave a comment